মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০
সব ব্যাপারে হেলাফেলা করা যায় না

সব ব্যাপারে হেলাফেলা করা যায় না

ভারতবর্ষীয় দেহতত্ত্বে উনপঞ্চাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। ওই তত্ত্বমতে, উনপঞ্চাশ বছর বয়সে কোনো পুরুষকে হয় ভীমরতিতে ধরে, অথবা সে পাগল হয়ে যায়। সেই জন্যই বলা হয়, লোকটাকে উনপঞ্চাশে পেয়েছে। উনপঞ্চাশে পাওয়া মানুষ কখন কী করে বসে, তার ঠিক নেই। বর্তমান কলিকালে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো রাষ্ট্রকেও উনপঞ্চাশে পেয়েছে। যেমন বাংলাদেশ। অথচ উনপঞ্চাশ বছর বয়সে একটি স্বাধীন জাতি পরিপক্বতা অর্জন করে, সে হয় পূর্ণ বিকশিত।

বাঙালিকে নানা রকম অপবাদ দেয় অনেকে, কিন্তু উনপঞ্চাশ বছরে বাঙালি কোনো তালিকা নিখুঁত, নির্ভুল ও নিরপেক্ষভাবে করেছে—এমন অপবাদ তাকে তার ঘোরতর শত্রুও দিতে পারবে না। তা আদমশুমারির তালিকা হোক, ভোটার তালিকা হোক বা ভিজিএফ/ভিজিডি কর্মসূচির অতিদরিদ্রদের তালিকা হোক। এক ইউনিয়নের ৫০০ জন অতিদরিদ্রের তালিকার মধ্যে অর্ধেকই ভুয়া নাম। আবার এমন লোকের নাম আছে, যার বাড়িতে টিনের ঘর তিনখানা, বিঘা পাঁচেক ধানি জমি এবং আথালে গরু চারটি।

কোনো নামের তালিকা করতে গিয়ে নামধামের বানান ভুল করা শিক্ষিত বাঙালির সাধারণ ব্যাধি। যাঁর নাম সুলতানুদ্দিন ঘরামি, ভোটার তালিকায় তাঁর নাম হয়েছে সয়তানুদ্দিন হারামি। বাপের নাম ঠিক থাকল কি না-থাকল, তা বিবেচ্য বিষয় নয়। কারও গ্রামের নাম কবিরপুর, লেখা হয়েছে কবরপুর। এসব অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু যা অসাবধানতাবশত নয়, সেটা অন্য ক্ষেত্রে। মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে যেসব কর্মকর্তার সরকারি চাকরিতে ঢোকার সৌভাগ্য হয়েছিল, তাঁদের কারও বয়স একাত্তরে ছিল দেড় থেকে চার বছর। বছর কয়েক আগে তাঁদের নিয়ে সুখপাঠ্য প্রতিবেদন হয়েছিল জাতীয় দৈনিকগুলোতে। জাতির জীবনের মহত্তম ঘটনাটি নিয়ে এ-জাতীয় ছলনা মানবজাতির ইতিহাসে কোনো কালে, কোনো দেশে ঘটেছে বলে শোনা যায় না।

বাঙালি মুসলমান পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঐতিহাসিক ভুল করেছে বহুবার, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে ক্ল্যাসিক ঐতিহাসিক ভুলটি করল এবার রাজাকারের তালিকা নিয়ে। ভুল মানুষমাত্রেরই হতে পারে, কিন্তু এত ভুল নয়। সাংবিধানিক ও নৈতিকতার দিক থেকে দেখলে এ কাজ সরকার বা রাষ্ট্র করতে পারে না। শুধু কোনো মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো সাধারণ নাগরিককে জাতির সবচেয়ে ঘৃণ্য মানুষদের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা ক্ষমাহীন অপরাধ। রাষ্ট্র কোনো অভিযুক্তকে বিচার করে শাস্তি দিতে পারে, তার মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে না। রাষ্ট্র কাউকে অপমান করতে পারে না। সে অধিকার আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রকে দেয়নি।

কয়েক দিন আগে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তিনটি প্রতিনিধিদল ভিয়েতনামসহ এশিয়ার তিনটি দেশে শিগগিরই সফরে যাচ্ছে। তাদের এই সফরের উদ্দেশ্য, সেসব দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন। প্রতিনিধিদলের সদস্যদের জন্যই যে এই সফরের সংবাদ আনন্দের তা-ই নয়, আমাদের সবার জন্যই তা খুশির বিষয়। এই জন্য তা খুশির যে অন্য দেশের মানুষ কী করেছিল যুদ্ধের পরে, তা স্বচক্ষে দেখে এলে ভালো এবং তা জেনে আসার পরে যদি রাজাকারের তালিকা প্রকাশিত হতো, তাহলে এই জঘন্য ঘটনা হয়তো ঘটত না।

কোনো কাজ করতে গিয়ে কারও ভুল হতেই পারে; কিন্তু তালিকাটি প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে সেই ভুল সম্পর্কে যে বয়ান ও ব্যাখ্যা শোনা গেল, তা ভুলের চেয়ে আরও বেশি বিস্ময়কর। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দোষ চাপানো হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে। তারা যে বস্তু দিয়েছে, তা-ই শুধু প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। একপর্যায়ে মানুষের চেয়ে দোষ গিয়ে পড়ল প্রাণহীন পেনড্রাইভের ওপর। আবার শোনা গেল, এ তালিকা সেই বাহাত্তর সালেই করা, এখনকার কারও এই কর্মের দায় নেই; কিন্তু কোনোটাই যখন জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হলো না, তখন বলা হলো এ তালিকা বিএনপির সময় করা। এ যেন সেই উনপঞ্চাশে পাওয়ার দশা।

আলোচ্য তালিকার নামকরণ যথার্থ হয়নি। রাজাকার একটি ভিন্ন প্রজাতি। সেটি পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সহযোগী বাহিনী। তারা ভাতা বা গম পেত। একটি ছিল আলবদর বাহিনী। আরেকটি আলশামস। রাজাকার শব্দটি এখন যেন একটি বিশেষণ। সব শ্রেণির স্বাধীনতাবিরোধীকেই বলা হচ্ছে রাজাকার। সে হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষে যাঁরা জাতিসংঘে বা বিদেশে তদবির করতে যান, তাঁরাও রাজাকার। রেডিও, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেছেন, তাঁরাও রাজাকার। যেসব পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পাকিস্তান সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁরাও রাজাকার। সরকারের উদ্যোগে যে ‘শান্তি কমিটি’ গঠিত হয়, প্রধানত মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে, তাঁরাও রাজাকার; কিন্তু স্বাধীনতার পরে সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের দালাল বা কোলাবরেটর বলে চিহ্নিত করে। ওই নামেই দালাল আইন করা হয়।

বাহাত্তরের জানুয়ারিতে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীদের দেখতে যান। আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী দীন মুহম্মদ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁকে দেখে তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, ‘আপনি এখানে?’ পরে আমাদের বললেন, ‘অনেককেই তো দেখতেছি আমাদের চেনাজানা মানুষ।’

কোনো জাতির স্বাধীনতাসংগ্রাম কোনো ছেলেখেলা নয়। তা শুধু আকস্মিক যুদ্ধবিগ্রহের ব্যাপারও নয়। তার থাকে দীর্ঘ পটভূমি। শুধু অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ হলো, শত্রু পরাজিত হলো, দেশ স্বাধীন হলো, তেমনটি নয়। যিনি সেই স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দেন, তিনি জানেন জনগণের আবেগ-অনুভূতি, মানুষের মনস্তত্ত্ব। রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে মনোবিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে বহু বই রচিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর সরকার পাকিস্তানের দালালদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ছাড়া অন্য দালালদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কোন নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা বাংলাদেশের দল-নির্বিশেষে সব সরকারের বিবেচনায় থাকা দরকার। এখনকার আওয়ামী লীগ নেতারা যদি মনে করেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বেশি দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল, তা যে শুধু বড় ভুল হবে তা-ই নয়, তা দেশকে বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। জনগণকে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত করা নয়, ঐক্যবদ্ধ করাই জাতীয় নেতার কাজ।

দালালদের দুষ্কর্ম ও ভূমিকা নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তি গবেষণা করছেন। তাঁদের কাছে তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। বাহাত্তরে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, শান্তি কমিটির মুসলিম লীগের পাকিস্তানগতপ্রাণ অনেক নেতা মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহায়তা করেছেন, জানমাল রক্ষা করেছেন সাধারণ মানুষের। একাত্তর ছিল বাঙালির ইতিহাসে একটি অস্বাভাবিক দুঃসময়। অনেকের কাছেই নিজের ধর্ম প্রাণের চেয়ে প্রিয়। আমার পরিচিত জয়দেবপুরের এক হিন্দু পরিবার ধর্মান্তরিত হয়ে ‘মুসলমান’ হয়েছিল। তা যে কত বড় বেদনার ব্যাপার, এখন কাউকে বোঝানো যাবে না। ১৬ ডিসেম্বরের পরে তাঁরা গোবর খেয়ে স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করেন।

প্রতারণা করে সেই মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে কতজন ভাগ্য গড়ে নিয়েছেন, অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। চার সচিব মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুই বছর তাঁদের চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নেন। ওই সময় রাষ্ট্র থেকে যে বেতন, ভাতা, বাড়িভাড়া প্রভৃতি সুবিধা নিয়েছেন, রাষ্ট্র কি তা তাঁদের থেকে ফেরত নিয়েছে? তাঁরা কোনো শাস্তি পেয়েছেন? তালিকাভুক্ত রাজাকাররা অপরাধী। তাদের কি পুনরায় শাস্তির আওতায় আনা হবে?

আদিমকালে উপজাতীয় সমাজ গোত্রে গোত্রে বিভক্ত ছিল। ঘৃণা ও হিংসায় উন্মত্ত সেই সমাজ ছিল তমসাচ্ছন্ন। একটি আধুনিক উন্নত জাতি আলোকিত জাতি। মুক্তিযোদ্ধারাও চিরকাল বেঁচে থাকবেন না, রাজাকাররাও নয়। এমন কোনো কাজই করা উচিত হবে না, যা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী বিভক্তি ও শত্রুতার জন্ম দেয়। যাঁরা মুক্তিযোদ্ধার বংশধর নন, রাজাকারদের আওলাদও নন, সেই সব সাধারণ মানুষের জন্য রাষ্ট্র যেন বসবাসের অযোগ্য না হয়ে ওঠে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এক বিশাল ও বহুমাত্রিক ঘটনা। এত রক্ত, এত অশ্রু, এত বেদনা সেখানে জমাট হয়ে আছে, তা নিয়ে হেলাফেলা করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দলীয় স্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ এবং ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পেলে লাখো শহীদের আত্মার অভিশাপ থেকে আমরা অব্যাহতি পাব না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ লেখক ও গবেষক

 

উৎসঃ   প্রথমআলো

আরো পড়ুন

জেগে উঠতেই হবে, সম্বিত ফিরে পেতেই হবে

আমার পক্ষ থেকে সম্মানিত পাঠকদের জন্য, ২০১৯ সালের শেষ কলাম। আগামী তিনটি বুধবার লিখতে পারব …