বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০

মেয়েদের আত্মরক্ষা শেখাচ্ছেন তাঁরা

‘আমি ওদের বললাম, তোমরা আমাকে পাঞ্চ করো। দেখি, ওরা ৬০ জন একসঙ্গে আমাকে পাঞ্চ করতে এগিয়ে এসেছে। পরে যখন বললাম, একজন একজন করে, বুঝল। কিন্তু ওদের একেকটা পাঞ্চে যে হিংস্রতা, শক্তি আমি দেখেছি, তাতে অবাক হয়ে গেছি। মনে হচ্ছিল, ওরা সত্যিই যেন কোনো ধর্ষকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে’—হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে একটি সংগঠনের হয়ে মেয়েদের কারাতে শেখাতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন আয়েশা হোসেন মিম।

মিম জাতীয় দলের কারাতেকা, সিনিয়র খেলোয়াড় হিসেবে এখন অন্যদের শেখাতেও পারেন। কিছুদিন আগে হবিগঞ্জে এক পিকনিকে গিয়ে মেয়েদের জোর অনুরোধের মুখে পড়েন কারাতে শেখানোর। সময়টা মেয়েদের জন্য কতটা ভয়ংকর যাচ্ছে জানেন তিনি। কারাতেটা বেশির ভাগ সময়ই তাঁর জন্য ছিল খেলা। যা দিয়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক আসর থেকে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনার কথাই ভেবেছেন সব সময়। কিন্তু ধর্ষণপীড়িত একটি সমাজে আবার এটাই যে আত্মরক্ষার বড় হাতিয়ার হতে পারে মেয়েদের জন্য।

আয়েশা তাই শুধু ওই পিকনিকের আবদার রক্ষা নয়, পরে ওই হবিগঞ্জেই ‘দূর্বাঘাস’ নামে মেয়েদের একটি সংগঠনের মাধ্যমে কারাতে শেখানো শুরু করেছেন। সেখানেই মেয়েদের আগ্রহ, প্রতিশোধস্পৃহা ফুটে উঠতে দেখেছেন তাঁদের প্রতিটি পাঞ্চে। এই মুহূর্তে শুধু আয়েশাই নন, দক্ষিণ এশীয় গেমসে সোনাজয়ী হুমায়রা আক্তার, তাঁর ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদৌস, তায়কোয়ান্দোর রুমকি সিদ্দিকা, জিনাত রেহানাসহ অনেকেই শুধু খেলায় আটকে না থেকে এগিয়ে এসেছেন মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে।

হুমায়রা, জান্নাতুলরা কিছুদিন আগে মাদারীপুরে গিয়েছিলেন তেমনি একটি কর্মসূচিতে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সের শখানেক মেয়েকে তাঁরা কারাতের বিভিন্ন কৌশল শিখিয়েছেন, দেখিয়েছেন। এই শেখাটা খুব জরুরিও মনে করেন জান্নাতুল, ‘সত্যি বলতে আত্মরক্ষার কিছু কৌশল জানা থাকলে রাস্তাঘাটে চলতে-ফিরতে মনের মধ্যে একটা সাহস কাজ করে। মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রেই আতঙ্কিত হয়ে অপরাধীদের উল্টো সুযোগ করে দেয়। কিন্তু একটু সাহস দেখাতে পারলে হয়তো পরিস্থিতিটা ভিন্ন হয়।’ মোহাম্মদপুর তায়কোয়ান্দো ক্লাবে ছেলে-মেয়েদের মার্শাল আর্ট শেখানো হচ্ছে অনেক দিন থেকেই। তবে এই মুহূর্তে মেয়েদের জন্য বিশেষ ব্যাচ খুলতে হচ্ছে তাদের। ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ তায়কোয়ান্দো ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল ইসলামও বলছিলেন মেয়েদের নতুন করে মার্শাল আর্টে আগ্রহী হওয়ার কথা, ‘এখন প্রতিদিন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের মেয়েরা দল বেঁধে আসছে তায়কোয়ান্দো শিখতে। আমরা অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারে উৎসাহী করে আসছি তাদের। আত্মরক্ষা করতে শেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মূলত ওদের কিছু কৌশল শিখিয়ে দিচ্ছি, শরীরের কিছু পয়েন্ট দেখিয়ে দিচ্ছি, যেখানে আঘাত করে সহজেই আক্রমণকারীকে কাবু করা সম্ভব।’

মোহাম্মদপুর ক্লাবের প্রশিক্ষক, জাতীয় তায়কোয়ান্দো দলের খেলোয়াড় রুমকি সিদ্দিকা জানিয়েছেন, করোনার সময় শুরুতে অনলাইনে প্রশিক্ষণ চালালেও এখন ক্লাবেই আসছে মেয়েরা। কেউ কেউ বাসায় গিয়ে শেখাতেও অনুরোধ করছে। তাঁরা সেটাও করছেন। বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা থেকেও তায়কোয়ান্দো শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ খেলাটায় হাতের চেয়েও বেশি ব্যবহার পায়ের, সন্দেহ নেই তা আত্মস্থ করতে পারলে কঠিন মুহূর্তে নিজেদের বরং আরো শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরতে পারবে তারা।

মাহমুদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ক্লাবগুলোকে প্রয়োজনে বিনা মূল্যেও শেখানোর নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন তাঁরা। কারাতে কোচ জসিম উদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে সেই উদ্যোগ নিয়েছেন আগেই। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় তাঁর একাডেমিতে সপ্তাহে এক দিন বিনা মূল্যে কারাতে শেখানোর ঘোষণা দিয়েছেন শুধু মেয়েদের জন্যই, ‘এই মুহূর্তে সব মেয়েদেরই আত্মরক্ষার কৌশলগুলো জেনে রাখা উচিত। আমাদেরও উচিত যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসা।’

আরো পড়ুন

ঢাকায় বাড়ছে ডেঙ্গু, ২৪ ঘণ্টায় ২৫ রোগী হাসপাতালে ভর্তি

কভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেই ঢাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে …