বিনোদন

মানুষের ভালোবাসার কাছে আমার প্রাপ্তি সীমাহীন

১৯৮৪ সালের ৮ জানুয়ারি বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘অন্তরঙ্গ’তে গাইলেন মইনুল ইসলাম খানের সুরে ‘এলোমেলো চুল আর ললাটের ভাঁজ’। এরপর বদলে গেল চারপাশ। পেশাদার সংগীত জীবনে পার করলেন চার দশক। তিনি কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা। তার এই দীর্ঘ পথচলা নিয়ে কথা হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- তারেক আনন্দ

সংগীত জীবনের চার দশক পার করলেন। প্রথম গান ‘এলোমেলো চুল আর ললাটের ভাঁজ…।’ এক গানেই বদলে গেল আপনার জীবন। মইনুল ইসলাম খানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ও গানের শুরুর গল্পটা জানতে চাই।

ওনার সঙ্গে পরিচয় অনেক আগে ১৯৭৭ সালে। নতুনকুঁড়ির প্রতিযোগী ছিলাম আমি, আর উনি ছিলেন নতুনকুঁড়ির মিউজিক ডিরেক্টর। তখন তিনি কিশোর, আমি শিশু থেকে বড় হয়েছি। ৬ থেকে ৯ বছরের প্রতিযোগী ছিলাম। নতুনকুঁড়ির দলীয় সংগীতের মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন মইনুল ইসলাম খান। তখন থেকেই আমাদের পরিচয়। তারপর তিনি দেশের বাইরে ছিলেন কয়েক বছর। ফিরে আসার পর আবার গানের মাধ্যমেই দেখা। তখন তিনি বললেন, এখন তো বড় হয়েছো। বড়দের গান গাওয়াই। তখন আমার ওস্তাদজি বশীর আহমেদের কাছে গান শিখি। মইনুল ইসলাম খানের সুরে বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘অন্তরঙ্গ’র জন্য গান করব। আমি বিটিভির এনলিস্টেড ছিলাম না। সাধারণত সবাই এনলিস্টেড হয়েই বিটিভিতে গান করে। আমার জন্য স্পেশাল অনুমতি নিয়ে ওই গান করা হলো। ১৯৮৪ সালের ৮ জানুয়ারি বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘অন্তরঙ্গ’তে মইনুল ইসলাম খানের সুরে প্রচার হলো ‘এলোমেলো চুল আর ললাটের ভাঁজ’। গান প্রচার হওয়ার পর আমাকে বিটিভি তালিকাভুক্ত করে নেয়।

এলোমেলো চুল আর ললাটের ভাঁজ…। আপনার বিখ্যাত এক গান। এক গানেই শোরগোল পড়ে গেল চারদিকে?

তখন অন্য কোনো চ্যানেল ছিল না, ক্যাসেটও ছিল না। মানুষ বিটিভি, বেতার শুনত বেশি। গান প্রচার হলে ব্যাপক রেসপন্স পাওয়া যেত। দেশে তো ছিলই ভারতের নানা জায়গা থেকে চিঠি আসত আমার নামে। ‘অন্তরঙ্গ’ অনুষ্ঠানটা প্রতি মাসে একবার হতো। চিঠিপত্রের বিভাগ ছিল। সেখানে গানটি প্রচারের জন্য অনুরোধ আসত। শ্রোতাদের অনুরোধের কারণে ওই অনুষ্ঠানে আমি আবার নতুন করে দুই বার পরিবেশন করি।

প্রথম গানেই আপনার বাঁক বদল। শিল্পী হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা কি এই গানের পরই শুরু হলো?

এটা ঠিক। সেই গান দিয়েই আমি দিকনির্দেশনা পেয়ে গেলাম। বিটিভির কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। সংগীতবোদ্ধা থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষের কাছে আমি পৌঁছে গেলাম। গান প্রচারের পর দিনই প্রথম ডাকেন আলম খান। কিন্তু চলচ্চিত্রে প্রথম গেয়েছিলাম আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘বিধাতা’ সিনেমার ‘আপন কভু পর হয় না রে’। গানের কথা লিখেছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি পরিচালক, প্রযোজক ছিলেন। সিনেমা মুক্তি পায় চুরাশি সালের প্রথম দিকেই। এক সপ্তাহের মধ্যেই আলী ভাইয়ের গান, সত্য সাহার সুরে, মনসুর আহমেদ, আনোয়ার পারভেজ, মনসুর আলীর সুরে। এই শুরু হলো সিনেমার গানে যাত্রা।

মইনুল ইসলাম খানের সুরে কয়টি গান প্রকাশ হয়েছে আপনার?

দুই থেকে আড়াইশ’ গানের মতো প্রকাশ হয়েছে। ওনার যত সুর প্রায় সব গানই আমি গেয়েছি। পাঁচ-ছয়টি ক্যাসেটও ছিল। ‘আমি নই বনলতা সেন’, ‘নীলাঞ্জনা নামে ডেকো না’, ‘এলোমেলো চুল আর ললাটের ভাঁজ, ‘রক্ত রাঙা সন্ধ্যা রবি’, ‘পড়ল ঝরে কৃষ্ণচূড়া’, ‘কথা দাও সেই কথা’, ‘যে দেশেতে শহীদ মিনার’, ‘ওই পতাকা আমার মায়ের মুখের মতো’, ‘ওই শ্যামল কোমল মাটির পরশ’, ‘আমার একটা ছোট্ট বাড়ি পাশে পদ্মপুকুর’ প্রমুখ গান।

এই যে এত কাজ। কাজের ফাঁকেই কি দুজনার ভালোবাসা, পরিণয়?

এটা আসলে কীভাবে যে বলি! বয়সের একটা ব্যাপার থাকে। ওনার একটার পর একটা গান গাচ্ছি। যেমন বিটিভির আরেকটা অনুষ্ঠানের কথা অনেকের মনে আছে নিশ্চয়ই। ফজলে লোহানীর বিখ্যাত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’। এটা যখন প্রচার হতো তখন দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেত। সেই অনুষ্ঠানের জন্য গাইলাম ‘আমি নই বনলতা সেন’ ও ‘অঙ্কুরে জীবন স্বপ্ন দেখো না’। দুই গানের জন্য পরপর দুই বার গাইলাম ’৮৪, ’৮৫ সালের দিকেই। সুরেলা পরিবেশে জন্ম হয়েছে আমার। বাবা ছিলেন উঁচুমানের সংগীতশ্রোতা। যেনতেন গান আব্বা জীবনেও শুনেন নাই। এছাড়া আমার ওস্তাদজী বশীর আহমেদ। ওনার কাছে আমি যা শিখেছি তা তো বাংলাদেশকে দিতেই পারলাম না। শাস্ত্রীয় সংগীত এবং বরে গোলাম আলী খাঁ সাহেবের ঠুমরি, ভজন, এগুলো তো বাংলাদেশে গাওয়ার সুযোগই হলো না। যাই হোক, আমাদের পারিবারিকভাবে সংগীতের রুচি ছিল উঁচু লেবেলে। যখন খান সাহেব একের পর এক ‘এলোমেলো চুল ললাটের ভাঁজ’, ‘আমি নই বনলতা সেন’,Ñ এসব গান শুনলে দর্শকরাও ঘেমে যাবে। উনি উচ্চমার্গীয় সুরকার। একটার পর একটা গান আমাকে দিয়ে যাচ্ছেন। গান শুনতে শুনতে আমার বাবা অভিভূত, কৃতজ্ঞ। আমাদের পুরো পরিবার ওনার ভক্ত হয়ে গেলাম। তখন বয়সও ছিল প্রেমে পড়ার। প্রেমে পড়েই গেলাম আরকি! আমাদের প্রেম লম্বা সময় পর্যন্ত থাকেনি। বাবা-মা টের পেয়ে বিয়ে দিয়ে দেন। আমাদের বিয়ে অর্ধেক প্রেম, অর্ধেক পারিবারিক। জানুয়ারিতে গান গাওয়া শুরু ’৮৪ সালের ডিসেম্বরেই বিয়ে। চুরাশি সালটাই আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

দেশের বিখ্যাত শিল্পী বশীর আহমেদ। তিনি আপনার ওস্তাদ ছিলেন। আপনার গানের প্রসঙ্গে আবার আসছি। তার ফাঁকে ওনার সম্পর্কে যদি বলতেন। আপনার গান শেখা থেকে দেখা, বিস্তারিত…

আমি খুবই ভাগ্যবান। আমার জীবনে তিনজন মানুষের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমার বাবা, ওস্তাদ জী এবং আমার হাজব্যান্ড এই তিনজন মানুষ আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছেন সেভাবেই শিখেছি, পথ চলছি। ওস্তাদজী আমাকে শুধু গান শেখাতেন না, জীবন শেখাতেন। একজন শিল্পীকে কীভাবে হাঁটতে হবে, বসতে হবে, সালাম দিতে হবে, কোন জায়গায় কী কথা বলতে হবে, কোন জায়গায় চুপ থাকতে হবে, আদব-কায়দা, কীভাবে শিরদাঁড়া সোজা করে বসতে হবে, দমটা কোথায় থেকে নিতে হবে। সব ওস্তাদজি শেখাতেন। ওনার বাসাতেই ক্লাস নিতেন। কখনো লিপস্টিক দিয়ে গেলে উনি বলতেন, যাও রঙ ধুয়ে আস। কারণ তোমরা তো ছোট বাচ্চা। তোমরা তো এমনিই রঙিন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করতেন, পরীক্ষার রেজাল্ট কি হয়েছে? মুসলমান হলে তিনি বলতেন, আজ নামাজ পড়ছ কিনা? তুমি কি কোরআন পড়তে পার? বাবার কাছ থেকে জীবন শিখেছি, ওস্তাদজীর কাছেও শিখেছি। তেমনি আমি আমার স্বামীর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখছি। বশীর আহমেদকে ওস্তাদ হিসেবে পাওয়ায় আমার গানের জীবন সহজ হয়ে গেছে। আমি খুবই কৃতজ্ঞ ওনার কাছে। ৬ বছর বয়স থেকে টানা ১২ বছর গান শিখেছি। এর মধ্যে কোনো গ্যাপ নেই। অনেক কষ্ট করে আমাদের বাড়ি মাদারটেক থেকে সেই কাদা-পানি পেরিয়ে, বাসাবো আসতাম। রিকশায় করে মালিবাগ যেতাম, এরপর বাসে যেতাম শ্যামলী। তারপর মোহাম্মদপুর বাবর রোড। সব সময় বাবাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন।

চলচ্চিত্রে আপনার টার্নিং পয়েন্ট কোন গানে?

কানে লাগে না এমন গান দু’চারটা প্রকাশ হলো। সে সময় আমাকে দিয়ে স্যাড রোমান্টিক, কঠিন গান- এমন গানই সবাই গাওয়াইতো। এরপর আবু তাহের ভাই গাওয়াইলেন মনিরুজ্জামান মনিরের কথায় সালমান-শাবনূর অভিনীত চলচ্চিত্র ‘তুমি আমার’ সিনেমার ‘দেখা না হলে একদিন, বুকের ভেতর করে চিন চিন চিন…।’ আমি আর আগুন গেয়েছিলাম গানটি। এই গানটিই আমার বাঁকবদল করা গান। সবার মুখে মুখে চলে এলো। এরপর জীবনে প্রথমবারের মতো এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে গাইলাম ‘নাফরমান’ সিনেমায়। এটির সুরকার মইনুল ইসলাম খান। ‘সোনা চাঁন হিরা মানিক দেবার কিছু নাই’। এই গান দিয়ে কিশোর দার সঙ্গে পরিচয়।

প্লেব্যাকে দুর্দান্ত যাত্রা শুরু হয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুর, সংগীতে গান গাওয়ার পর। তাহের ভাইয়ের ‘দেখা না হলে একদিন….’ গাওয়ার পর শাকিলা জাফর আপা বললেন, তোকে তো বুলবুল ভাই খুঁজছে, যোগাযোগ কর। তখন আমাদের ফোন ছিল না। একদিন গেলাম। বুলবুল ভাইয়ের সুরে প্রথম গান করলাম খালিদ হাসান মিলু ভাইয়ের সঙ্গে। সিনেমার নাম ছিল ‘সাক্ষী প্রমাণ’। ‘আজও আছি কালও রবো, যুুগে যুগে আমি তোমারই হবো…।’ এই যে গাইলাম, গাওয়ার পর আর দম ফেলার সুযোগ পাইনি। এটা হলো সিনেমার গানে দুর্দান্ত যাত্রা। এরপর কয়েকটা গান গাওয়ার পর একে একে এলো ‘তুমি আমার এমনই একজন’, আরেকটা ফোক গান গেয়েছিলাম, ‘কত মানুষ ভবের বাজারে’। সেই গানের সময় প্রডিউসার বলতেন, এটা তো ফোক টাইপ গান, ফোক শিল্পী গাইলে ভালো হয় না? বুলবুল ভাই বিরুদ্ধাচরণ করে বলতেন, না, না, ভাবিই গাইবে। ওনার প্রত্যেকটা ছবিতে সাতটা গান থাকলে ছয়টি গানই আমার। আর যত সুরকার আছে সবার সিনেমায় আমার একটা গান হলেও থাকত। আমার কণ্ঠ সিগনেচার টিউন হয়ে গেল।

আপনি একজন সংগীত পরিচালকের স্ত্রী, অন্য সংগীত পরিচালকের গান করতে কখনও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি?

একদমই যে পড়তে হয়নি তা নয়, প্রথম দিকে সাংবাদিকরা গসিপ ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। কনকচাঁপা ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় ওনার হাজবেন্ড সামনে বসে থাকেন কেন। আমাদের দু’জনের বোঝাপড়ার কারণে কেউ হালে পানি পায়নি। আর কয়েকজন মিউজিক ডিরেক্টর বলেছেন, উনি যদি (আমার স্বামী) গানের সময় তোমার কাছে এসে বসে থাকে, তাহলে তো জীবনে তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। খান সাহেব তখন বলতেন, শোন, জীবনে অনেক গান গাওয়া হবে, আমি তোমাকে বললাম। আজ প্রোগ্রামে কোন শাড়ি পরব? জর্জেট, নাকি কাতান? উনি আমাকে বলতেন, তুমি একদম সিম্পল থাকবা। আমি বলেছিলাম, মানুষ তো শিল্পীদের ঝিকিমিকি দেখতে চায়। তিনি বলতেন, তোমার ঝিকিমিকি লাগবে না। তোমার গানে ঝিকিমিকি আছে। মানুষ যখন বলছে, রেকর্ডিংয়ে এসে বসে থাকে, কীভাবে গান হবে? উনি বলতেন, এভাবেই গান হবে। আমি বসে থাকব, তোমার গান আরও বেড়ে যাবে। তুমি শুধু গানে মনোযোগ দাও। আর কোনো দিকে মনোযোগ দেবে না।

কনকচাঁপার শক্তিই ছিল কণ্ঠ, এটা আপনার স্বামী বুঝেছেন অনেক আগেই।

সেই শক্তিটাই উনি আমাকে মনে করিয়ে দিতেন। আমি একটু দুর্বল, নরম-সরম মানুষ। ক্যারিয়ার শুরুর অনেক দিন পর আমাদের দেশের বড় একজন মানুষ বিদেশে প্রোগ্রামের কথা বললেন। আমাকে একা যেতে হবে। যখন আমি বলছি, আমি তো একা যাব না। তখন তিনি বললেন, আমি ভবিষ্যদ্বাণী করে গেলাম, জীবনেও বিদেশে যেতে পারবেন না। আর খান সাহেব বলতেন, তুমি রেওয়াজ করতে থাকো, ফুল ফ্যামিলি নিয়ে যাবে বিদেশে। সত্যি সত্যি তাই হয়েছে, আমার পুরো ফ্যামিলিসহ ইউরোপ, আমেরিকা ঘুরে আসছি, বাচ্চা-কাচ্চা, বাপ-মাসহ। আমাকে যে খান সাহেব শুধু গানেই সহযোগিতা করেছেন তা তো নয়। উনি সুর করছেন, সুরের প্রেমে পড়েছি শুধু তা নয়, উনি তো একটা মানুষ। ওনার তো সুন্দর একটা ক্যারিয়ার ছিল। উনি আমার ক্যারিয়ারকে উপরে তুলতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন। উনি যত বড় মাপের সুরকার, আরও অনেক অনেক উপরে থাকতেন। উনি বলতেন, তোমাকে তৈরি করা আমার দায়িত্ব। অবশ্যই উনি সেক্রিফাইস করেছেন। আমি এখনও ইমোশনাল হই, কাঁদি, আবার তাকে সালাম করি। একটা মানুষ কীভাবে, এতটা আত্মত্যাগ করতে পারে!

মইনুল ইসলাম খানের সঙ্গে পরিচয় না হলে কি কনকচাঁপা হতো না?

হয়তো হতো, আবার না, বা এ পর্যন্ত আসতেই পারত না। আমাদের দেশে অনেক প্রতিভা আছে, সব প্রতিভাই তার বাবার কানে ধরা পড়ে না, আমার বাবা যে অর্থনৈতিক লেবেলে ছিল, সৎ একজন সরকারি কর্মকর্তার কত পয়সা থাকে? অত সচ্ছল ছিল না। আমার বাবার সেক্রিফাইস, স্বামী এবং আমার ওস্তাদজিÑ এই তিনজনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, তাদের ভালোবাসার সংমিশ্রণেই কনকচাঁপা হতে পেরেছি। তাদের উপরে হেলান দিয়েই আমি দাঁড়িয়ে আছি।

মান-অভিমান তো সব পরিবারেই হয়। আপনাদের বড় কোনো অভিমান হয়েছিল জীবনে?

না, একদমই না। তিনি একটু রাগি, সবাই এমনই জানে। কিন্তু কনকচাঁপাকে সঠিক পথে নিতেই তিনি শক্ত হয়ে এমন ছিলেন। কনকচাঁপা এখানে যাবে না, কনকচাঁপা ওটা করবে না। অন্য মানুষরা মনে করতো এগুলো ওনার চাপিয়ে দেওয়া। কিন্তু আমি যে এভাবে অভ্যস্ত সেটা অন্যরা বুঝত না। একই প্রফেশনে যখন দু’জন মানুষ থাকে তখন কিন্তু পারসোনালিটি কনফ্লিক্ট এবং প্রফেশনালি জেলাসি, এই দু’টাই থাকে। অনেকের জীবনে অশান্তি নেমে আসে, সংসার ভেঙে যায়। আমরা আসলে দুই মানুষ এক হয়ে গেছি। খান সাহেব কোনো দিন আমার কাজে অলসতা করেনি। আমি বিস্মিত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সারা রাত, ঝড়-বৃষ্টি, একটা মানুষের কত ধৈর্য, কত ভালোবাসা, কত স্নেহ থাকলে এর বাইরেও আরেকটা অনুচ্চারিত শব্দ আছে, যা আমি প্রকাশ করতে পারছি না। এতটা নিবেদিত হতে পারে।

যখন সিনেমায় গান গাওয়া শুরু করলেন, তখন চারপাশে অনেক বড় বড় নাম। তাদের ভিড়ে কনকচাঁপার উঠে আসা কতটা চ্যালেঞ্জ ছিল?

আমি কোনো কষ্টই টের পাইনি। আমাকে উনি ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগিতায় নাম লেখাতেই দিননি। আমার হাজবেন্ড আমার প্রেমিক, এটা ঘরের পরিচয়। গানের জগতে উনি ওস্তাদ, পথপ্রদর্শক। অন্ধরা যেমন রাস্তা পার হয় হাত ধরে, তিনিও আমার কাছে তাই। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি, কোথাও গেলে রাস্তা পার হওয়ার সময় ওনার হাত ধরেই পার হই। গাড়ি আসছে কিনা তাকাই না। ওনার গাড়িতে চড়ে সারা বাংলাদেশ চষে বেড়াই। গাড়িতে নাক ডেকে ঘুমাই। গানের জন্যও আমি কোনো দিন কোনো দিকে তাকাইনি। আমাকে উনি তাকাতেও দেননি। উনি বলেছেন, তোমার কাজ হলো রেওয়াজ করা। তোমার গান হিট হলো কিনা, মানুষ শুনল কিনা এগুলোর দিকে কোনো দিন তাকাবা না। প্রথমদিকে চট্টগ্রাম হাটহাজারীতে একটি প্রোগ্রামে গেছি। এলোমেলো চুল, আরেকটা গান পরিবেশন করলাম। এরপর আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কি গান গাইব? একটা চটুল গান তুলেছিলাম, এটা গাব? উনি বলছেন, জীবনেও না, কখনও না, কোনো দিনও না। তোমার গানই গাও। তোমার গান শুনে কেউ নাচবে না বা হাত তালিও দেবে না। কিন্তু শুনবে, চুপ করে বসে থাকবে। এখন আমি নিজের অনেক চটুল গানও মঞ্চে গাই। এগুলো তো আমার গান। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেও কনকচাঁপা মঞ্চে চটুল গান পরিবেশন করেনি।

তার মানে আপনাকে স্টেজে কাভার সং করতে হয়নি?

স্টেজে আমার গানই গাই। একজন শিল্পীকে তো চাল-ডালও কিনতে হয়। কাভার সং আমি অনেক গেয়েছি। আর্থিকভাবে আমাকে পাঁচ ছয়-বছর সাপোর্ট দিয়েছে কাভার সংয়ের ক্যাসেটগুলো। ‘ডন’ থেকে যে ক্যাসেটগুলো প্রকাশ হয়েছে সেগুলোকে আমি কখনও অশ্রদ্ধা ভরে দেখি না। অনেক ভালো ভালো গান আমার কণ্ঠে শ্রোতারা পেয়েছেন। কাভার সংয়ের শিল্পী হিসেবেও আমাকে আমার শ্রোতারা অনেক পছন্দ করেছে। আমার সৌভাগ্য যে, আমার নিজের গান একটার পর একটা জনপ্রিয় হয়েছে। ভক্তরা যখন চার-পাঁচশ গান লিস্ট করে পাঠায় তখন আমি অবাক হই! এটা কীভাবে সম্ভব? পাঁচশ গান লিস্ট করা কিন্তু সম্ভব না। কারণ আমি গান গেয়েছি চার হাজারের মতো। এই চল্লিশ বছরে অনেক প্রাপ্তি। আলহামদুল্লিাহ।

যাদের প্রতি আপনি চিরকৃতজ্ঞ?

আমি একজন সংগীতশিল্পী। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের পথচলায় মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি আমার কাছে পরিবারের মতোই। সবার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। প্রথমে আমি মইনুল ইসলাম খানের কথাই বলব। কারণ ওনাকে দিয়েই আমার জীবন শুরু। তারপর সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলাউদ্দিন আলী, আলম খান, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সেলিম আশরাফ, সত্যসাহা। সত্য দার গান আমি খুব কম করেছি। কারণ আমি যখন গান শুরু করি তখন তিনি কাজ কম করেন। ওনার শেষের দিকের কথা। তারপর আলম খানের অনেক গান করেছি, আবু তাহের ভাই, পরবর্তী জেনারেশনের শওকত আলী ইমন, আলী আকবর রুপু, ইমন সাহা প্রমুখ। আমি যাদের সুরে একটি গানও গেয়েছি তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ।

জুটি হিসেবে এন্ড্রু কিশোর-কনকচাঁপা ব্যাপক জনপ্রিয়। এরপর কাদের সঙ্গে গাইতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন?

এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে অনেক কালজয়ী গান। প্রায় দুই হাজারের মতো গান গেয়েছি কিশোর দার সঙ্গে। আইয়ুব বাচ্চু-কনকচাঁপারও কিন্তু অনেক হিট গান, এটা অস্বীকার করা যায় না। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে খুব বেশি গান গাইনি। চল্লিশটির মতো হবে। এই চল্লিশ গানের একটিও মাটিতে পড়েনি। বাচ্চু ভাই খুব মজার মানুষ ছিলেন। বাচ্চু ভাই আলী ভাইকেও বলত, বুলবুল ভাইকেও বলত, এই গান আমাকে দিয়ে হবে না বস। তারপর যখন ধমক দিত তখন তিনি গেয়ে দিতেন। গাওয়ার পর গান হয়ে যেত ক্ষীর! আমরা যতগুলো গান গেয়েছি সবই হিট। খালিদ হাসান মিলু ভাইয়ের সঙ্গেও গোল্ডেন গোল্ডেন গান। মিলু ভাইয়ের সঙ্গেও তিন, চারশ’ গান গেয়েছি। বিশ^জিৎ দাদা বেছে বেছে গান করতেন। বিশ^জিৎ দার সঙ্গেও পঞ্চাশটির মতো গান হবে। তপন দার সঙ্গে অনেক মঞ্চ শেয়ার করেছি। তবে, মঞ্চে জুটি হিসেবে সুবীর নন্দী-কনকচাঁপার গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যাপক।

স্বর্ণযুগটা পেলেন। এক সময় গান নিয়ে ছিল অনেক ব্যস্ততা। সংগীতের সেই সময়ের একে একে সবাই চলে যাচ্ছেন। এসব ভাবতে কেমন লাগে?

কতগুলো মানুষ চলে গেল। এগুলো আমি বোঝাতে পারব না। বুলবুল ভাই, আলী ভাই, আলম ভাই। তাহের ভাই অনেক আগে মারা গেছেন। ওনাদের মৃত্যু আমাকে কীভাবে ব্যথিত করেছে সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সুবীর দা, কিশোর দা, বাচ্চু ভাই নাই। নদী যেভাবে গ্রাম নিয়ে ভাঙে, আমাকেও সেভাবে ভেঙে ফেলছে। ওনাদের চলে যাবার সময় এমনভাবে কাঁদছি, কেঁদে কেঁদে অসুস্থ হয়ে গেছি। আমার হাজবেন্ড তখন হাল ধরেছেন। আমরা যে স্টুডিওগুলোতে কাজ করতাম একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের রেকর্ডিস্ট সাঈদ আহমেদ ভাই যেদিন মারা গেলেন আমি ভেঙে পড়লাম একদম। শ্রুতি রেকর্ডিংয়ের সাঈদ ভাই। উনি উঁচু দরের রেকর্ডিস্ট ছিলেন।

এখন আপনাকে একা মনে হয় না?

এই জায়গা থেকে উত্তরণ পেতে করোনা খুব সাহায্য করেছে। আমার এই যে একটা কালারফুল বর্ণাঢ্য জীবন। যেই করোনা এলো তখন সবাই নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম। পুরো বছর গেল, ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

সংগীতের পরিবর্তন। এই বদলে যাওয়াটাকে কীভাবে দেখেন?

সংগীত হলো নদীর মতো বহতা। আমি বদলে যাওয়া দেখি না। সংগীতকে কেউ কখনও কাটা কম্পাসের স্কেল দিয়ে বাঁধতে পারবে না। কোন গান কোন সময় হিট হবে সেটা বলা যায় না। আমাদের ব্যান্ড সংগীতকে এক সময় মানুষ মনে করত, আজেবাজে ছেলেপুলে গায়। তারপর কি হলো, একজন আজম খান ইনস্টিটিউট, আইয়ুব বাচ্চু দিকপাল, জেমস আমাদের রত্ন। প্রথম তারা যখন শুরু করেছেন তাদের কিন্তু অনেক ফাইট করতে হয়েছে। কিন্তু তারা এখন মূলধারায় জায়গা করে নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে সংগীত যদি কোনো বাঁক নিয়েও থাকে এই বাঁকবদল থেকেই ভালো কিছু হবে। মানুষ সব সময় বলে থাকে, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। অতীতকে খুব পছন্দ করে, বর্তমানে থাকে, ভবিষ্যৎকে ঘৃণা করে। এটা হলো বুড়ো মানুষদের চিন্তা। আমি কখনও বুড়া না। আমি পজিটিভলি চিন্তা করি। সেখানে নতুন ধারা যেটা আসছে, তাকে আমি স্বাগত জানাই। এটার মধ্যে যেটা ভালো সেটা থেকে যাবে, যেগুলো খারাপ তা থাকবে না এবং যারা নতুন আসছে তাদের জন্য আমার অনেক দোয়া।

সংগীতের চল্লিশে এসে অপ্রাপ্তি বলে কিছু মনে হয়?

অপ্রাপ্তি নয়, আমার প্রাপ্তির ঝুলি দীর্ঘ লম্বা। মেরিল প্রথম আলো চারবার। গানের যত শাখা আছে, একদম ছোটবেলায় সব স্বর্ণপদক পেয়েছি। ছোটবেলায় যেসব সুরকারের গান গেয়েছি, সেসব নাম শুনলে অনেকে আকাশ থেকে পড়বে। যাই হোক, জাতীয় শিশু পুরস্কার পেয়েছি সেটা প্রাপ্তি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি তিনবার। আমার জীবনে যেটা উপলব্ধি হলো দুই হাজার দশ সাল পর্যন্ত ক্যারিয়ারের বিশটা বছর হিট প্রাইম টাইম পার করেছি, অনেক গেয়েছি। সব সময় বলি আমি একজন শ্রমিক, কণ্ঠশ্রমিক। শ্রমিকের মতোই কাজ করেছি। এই চল্লিশ বছরে এমন কেউ বলতে পারবে না, আমাকে ডাকছে আর সময় মতো পায়নি। সেটা হয়নি কোনোদিন। ঝড়, বৃষ্টি থাকুক, ঈদ হোক, শবেবরাত, সব সময় ঠিক সময়ে হাজির হয়েছি। স্টেজের ক্ষেত্রেও তাই। রাত দুইটা, তিনটা কোনো ব্যাপার ছিল না। আমি এখন সুখি মানুষ। আমার পরিবার নিয়ে ভালো আছি। এক ছেলে, এক মেয়ে। আমার চুয়ান্ন বছর বয়স, পাঁচ পাঁচটা নাতি-নাতনি। সমস্ত কিছু প্রাপ্তি দিয়ে ভর্তি। অপ্রাপ্তি হলো, দেশের জন্য মন খুলে কাজ করতে চেয়েছিলাম। সেই জায়গা থেকে একটু অপ্রাপ্তি মনে হয়। নিজেকে সান্ত্বনা দিই এভাবে, আমি তো অনেক আগে থেকেই মানুষের পাশে আছি। সাধ্যমতো যতটুকু পারি মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। মানুষের ভালোবাসার কাছে আমার প্রাপ্তি সীমাহীন।