শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মহানবীর (সা) অনন্য নূর ও আদর্শের প্রতীক ফাতিমা (সা)

ইসলাম ধর্ম কেন শ্রেষ্ঠ ধর্ম, আল্লাহর নবী-রাসূলরা কেমন ছিলেন ও কেন এবং কিভাবে তাঁদের মেনে চলব ?-এসব প্রশ্নে উত্তর জানা খুবই জরুরি। আমরা অনেকেই ইসলামের মূল নেতৃত্বের স্বরূপ ও ধারাবাহিকতার বিষয়েও মাথা ঘামাই না। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কিংবা হযরত ফাতিমাকে যেভাবে জানা উচিত সেভাবে তাঁদেরকে জানতে পারিনি।

আমরা বলি হযরত ফাতিমা মহানবীর মেয়ে। কিন্তু এর চেয়ে বড় ও আসল পরিচয় হল তিনি বেহেশতের নারীদের নেত্রী। আমরা জানি, কেবল আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকলেই যে কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না। যদি তারা নবী-রাসূলগণের স্ত্রী-সন্তানও হয় তবুও না। হযরত নূহ (আ.)-এর স্ত্রী-সন্তান এবং হযরত লূত (আ.)-এর স্ত্রী জাহান্নামবাসী হয়েছে, এটি পবিত্র কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহর বিরোধিতা করে কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না। এমনকি কেউ যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্ত্রী-সন্তান হন, তবুও তাঁরা কেবল এ সম্পর্কের ভিত্তিতে বেহেশতে যেতে পারবেন না। যেমনটি বলা হয়েছে সূরা আহযাবের ৩০ নং আয়াতে :

‘হে নবীপত্নিগণ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল আচরণ করবে তার শাস্তি দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হবে এবং এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ।’
হযরত ফাতিমা মাত্র ১৮ বা ২০ কিংবা সর্বোচ্চ ৩০ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ‘বেহেশতবাসী নারীদের নেত্রী’ বলে সম্মান দিলেন। এটা স্পষ্ট, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) নিজের খেয়াল-খুশিমতো তাঁকে এ উপাধি দেননি। কারণ, কুরআনের ভাষায় তিনি প্রবৃত্তির খেয়ালে কোন কথা বলেন না। তাই আমরা বলতে পারি, হযরত ফাতিমা (আ.) ইসলামের জন্য অসাধারণ বড় খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন বলেই আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁকে এত বেশি ভালবাসতেন এবং তাঁকে অনুসরণ করতে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আমরা এ বিষয়ে উদাসীন থেকেছি।

ইসলামের মহানবীর কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। এ কারণে কাফের বা পথভ্রষ্টরা মহানবীকে নিয়ে উপহাস করে বলত যে নবী নির্বংশ হয়ে যাবেন। তাদের সে মশকরার জবাব হিসেবে সুরা কাউসার নাজিল হয়। কাউসার মানে অফুরন্ত নেয়ামত। তফসিরকারকদের মতে, কাউসার বলতে নবী কন্যা ফাতিমাকে ইংগিত করা হয়েছে। আল্লাহর বাণীর সেই সীমাহীন মহিমায় পৃথিবী আজও আওলাদে রাসুল বা নবী বংশের সন্তানদের পদচারণায় মুখর। অন্যদিকে এককালের সেই গর্বিত পুরুষ ও অন্ধকারের উপাসক ও মহানবীর প্রাণের শত্রু খল নায়কদের বংশ বিলীন হয়ে গেছে। সত্যিকার অর্থে নির্বংশ হয়ে গেছে আবু লাহাবের মতো গোত্রপতিরা। আর নবী বংশের জ্যোতিধারা রক্ষা পেয়েছে ফাতিমার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে।

মহানবীর আহলে বাইত বা পবিত্র বংশ হিসেবে রসুলে খোদার বংশধরকে যে শ্রদ্ধা জানানো হয়ে থাকে তার উৎসধারা ফাতিমা। যে যুগে নারীকে ভোগের পণ্য মনে করা হতো ও কন্যা সন্তানকে হত্যা করে পারিবারিক মর্যাদা রক্ষা করা যায় বলে মনে করা হতো সে যুগে হজরত ফাতিমার(সা) মাধ্যমে বংশ রক্ষার এই ঘোষণা এক অনন্য সমাজ বিপ্লবেরই ধ্বনি হয়ে ওঠে।

নবী নন্দিনী ফাতিমাকে ঘিরে এমন আরো অসাধারণ ঘটনা রয়েছে। নবী নিজ কন্যাকে ‘উম্মে আবিহা’ বলে সম্মান দেখাতেন। এর অর্থ ‘বাবার মাতা’। ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক দিনগুলোতে নবী মোস্তফাকে অশেষ কষ্ট ও লাঞ্ছনা সইতে হয়েছে। কাফিররা মহানবীকে বারবার আঘাত হেনেছে। ইবাদত মগ্ন রসুলে খোদার দেহে নোংরা এবং ময়লা পদার্থ ঢেলে দিত তারা। এই দিনগুলোতে হযরত ফাতিমা ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার কাজে ছিলেন মহানবীর দুঃসাহসী সহযোগী ও মাতৃতুল্য সেবিকা।

হজরত ফাতিমা সব যুগের নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে সম্মানিত। হুজুরে পাক বলেছেন, ঈসার মাতা মরিয়ম নিজ যুগের সম্মানিতা মহিলা। কিন্তু আমার কন্যা ফাতিমা সকল যুগের শ্রেষ্ঠ নারী। তিনি আরো বলেছেন, ফাতিমা আমার দেহের একটি অংশ, যে জিনিসে সে দুঃখ পায় তাতে আমিও দুঃখ পাই। ফাতিমা বেহেশতে সর্ব প্রথম প্রবেশে করবে। অন্যদিকে ফাতিমার অনুসারীদের স্পর্শ করবে না আগুন।
হযরত ফাতিমা কাছে এলে দ্বীনের নবী নিজে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে বরণ করে নিজের পাশে বসতে দিতেন। এ থেকে বোঝা যায় ফাতিমাকে সম্মান দেখানোর পেছনে রয়েছে ঐশীলোকের সুস্পষ্ট ইংগিত ।

ফাতিমার স্বামী আলী(আ)কে খোদ নবী নিজের জ্ঞান-নগরীর দরজা বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর দুই সন্তান ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনকে বেহেশতে যুবকদের নেতা বলেছেন মহানবী। অথচ ফাতিমা বা তাঁর বংশধরদের কেউই এই ঐশী সম্মানকে পার্থিব ভোগের কাজে লাগান নি। হজরত আলীকে (আ) মসজিদে তরবারির আঘাতে ও ইমাম হাসান(আ)কে বিষ দিয়ে শহীদ করা হয়েছে। আর ইমাম হুসাইনকে কি মর্মস্পর্শী পরিস্থিতিতে কারবালায় আত্মত্যাগ করেতে হয়েছে তা সবাই জানে।

আত্মত্যাগের বিশালত্বে ফাতিমা এবং তার বংশধররা এ ভাবেই ইতিহাসকে অতিক্রম করে গেছেন। এ সবই হলো ফাতিমার শিক্ষা, ত্যাগ এবং মহিমার শ্রোতধারার ফসল। তাদের সে আত্মত্যাগের গাঁথা আজও মানুষকে অন্যায়-অত্যাচার-জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রেরণা যোগায়। সত্যকে জানতে হলে, স্রষ্টার পথ চিনতে হলে এবং স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকতে হলে ধরতে হবে হযরত ফাতিমার পথ । হজরত ফাতিমা(সা) কেবল নবী দুলালি বা নারীদের আদর্শ নন তিনি এক কথায় আদর্শ মানবাত্মার প্রতীক ।

কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী রাজনৈতিক কারণে হযরত ফাতিমাকে আহত করা হয়েছিল প্রভাবশালী একটি মহলের পক্ষ হতে এবং পরবর্তীকালে এ আঘাতজনিত কারণেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

অনেকেই মনে করেন শত্রুতার প্রেক্ষাপটে হযরত ফাতিমা (সা)-কে দাফন করা হয়েছিল মধ্যরাতে গোপনীয়ভাবে অতি গোপন স্থানে যা আজো গোপন রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত গোপন থাকবে। হযরত ফাতিমার ওসিয়ত অনুযায়ী গোপনীয়তা বজায় রাখতে তাঁর দাফনেও অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয় মাত্র কয়েকজন অতি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে। মুসলমানদের মধ্য থেকে বিশ্বনবীর আহলে বাইতের অতি ঘনিষ্ঠ ওই কয়েকজন ব্যক্তি দাফনে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

ফাতিমা (সা) জানতেন কখন তাঁর মৃত্যু হবে। আর এ জন্য তিনি নিজে গোসল করে নতুন ও পরিষ্কার পোশাক পরে কিবলামুখী হয়েছিলেন।
তিনি নিজের মৃত্যু কবে হবে এবং তাঁর দুই প্রিয় সন্তান হাসান ও হুসাইন (আ.) কিভাবে মারা যাবেন সেই তথ্যসহ ভবিষ্যৎ ইতিহাসের অনেক খবর রাখতেন। হুসাইন (আ.)’র হত্যাকারীদের অভিশাপ দিয়ে গেছেন তিনি। মদিনার নারী সমাজ ধর্মীয় বিষয়সহ নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করত ফাতিমা (সা.আ.)’র কাছ থেকে। ফাদাক ও মানজিল শীর্ষক তাঁর ভাষণ এই মহামানবীর অতুল জ্ঞান, খোদাভীরুতা এবং দূরদর্শিতাকেই তুলে ধরে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ আলী, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের সন্তানদেরকে মানুষের জন্য হুজ্জাত বা দলিল করেছেন এবং তাঁরা হল জ্ঞানের দরজা।
‘মাসহাফই ফাতিমা’ নামে খ্যাত গ্রন্থটির সমস্ত তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে জিবরাইল ফেরেশতার সঙ্গে ফাতিমা (সা. আ.)’র কথোপকথনের মাধ্যমে যা লিখে গেছেন হযরত আলী (আ.)।

নবী-নন্দিনী (সা:) বলেছেন, পৃথিবীতে তিনটি জিনিস আমার খুবই প্রিয়। আল্লাহর পথে ব্যয়, রাসূলে খোদা (সা.)র চেহারার দিকে তাকানো এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত। পবিত্র কুরআনের আয়াত শ্রবণ মুসলমানদেরকে মুক্তির তীরে পৌঁছে দেয়।
ফাতিমা (সা. আ.) রাসূল (সা.)’র উম্মতের উদ্দেশে বলেছেন: আল্লাহ ঈমানকে তোমাদের জন্য শির্ক হতে পবিত্র হওয়ার ও নামাজকে অহংকার থেকে পবিত্র হওয়ার এবং আমাদের আনুগত্য করাকে ধর্মের ব্যবস্থায় বা ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যম করেছেন, আমাদের নেতৃত্বকে অনৈক্যের পথে বাধা ও আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বকে ইসলামের জন্য সম্মানের মাধ্যম করেছেন।

হযরত ফাতিমা (সা:) বলেছেন, আল্লাহর সেবায় মশগুল হয়ে যে সন্তুষ্টি পাই তা আমাকে অন্য সব সন্তুষ্টি বা আনন্দ থেকে বিরত রাখে এবং সব সময় মহান আল্লাহর সুন্দর দৃষ্টি আমার দিকে নিবদ্ধ রাখার প্রার্থনা ছাড়া আমার অন্য কোনো প্রত্যাশা নেই।
বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র বংশধর ও বিশেষ করে ফাতিমা (সা)’র প্রতি অশেষ দরুদ ও সালাম পাঠানোর পাশাপাশি সবাইকে আবারও শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি আজকের এই গভীর শোকের দিনে। হযরত ফাতিমা জাহরা (সা. আ.)’র একটি বক্তব্য তুলে ধরে শেষ করব আজকের এই আলোচনা। তিনি বলেছেন, নারীদের জন্য সর্বোত্তম বিষয় হচ্ছে, তারা যেন কোনো অচেনা পুরুষকে না দেখে এবং কোনো অচেনা পুরুষও তাদের না দেখে।

আরো পড়ুন

সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি প্রকাশ করল ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি প্রকাশ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজান মাস শুরু হবে …