বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০

‘প্রতিশোধের’ পতাকা উড়ছে ইরানে

মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মৃত্যু ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। ইরানে উত্তোলন করা হয়েছে ‘প্রতিশোধের পতাকা’। সঙ্গে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, সোলাইমানির মৃত্যুর ‘প্রতিশোধ’ সামরিকভাবেই নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, তেহরান হামলা চালালে ইরানের ৫২টি স্থানে হামলা চালানো হবে। তিনি উসকানি দিয়ে আরো বলেছেন, এমন হামলা চালানো হবে, যা ইরান আগে কখনো দেখেনি।

এদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা ইরাক গুরুত্বপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিজেদের ভূখণ্ড থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের একটি প্রস্তাবে গতকাল রবিবার সায় দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট সদস্যরা। উত্তপ্ত এই পরিস্থিতির মধ্যে শনিবার রাতে ইরাক থেকে দেশে পৌঁছেছে জেনারেল সোলাইমানিসহ ইরানের পাঁচ সেনার লাশ। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে লাখো মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। সবার মুখে একই স্লোগান—‘আমেরিকা নিপাত যাক’।

গত শুক্রবার ভোরে ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দর এলাকায় মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল সোলাইমানিসহ ১০ জন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি ধরা হতো সোলাইমানিকে। খামেনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘চরম প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে।

এর মধ্যে খামেনির সামরিক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন দেহগান বলেছেন, ‘আমাদের তরফ থেকে জবাবটা অবশ্যই সামরিক হবে এবং সেটা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধেই হবে।’ মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধটা যুক্তরাষ্ট্রই শুরু করেছে। ফলে এর পরিণতি তাদের ভোগ করতেই হবে। একটা উপায়েই এই যুদ্ধের ইতি ঘটতে পারে। সেটা হলো—তারা যে আঘাতটা করেছে, সেটার সমান ও পাল্টা একটা আঘাত তাদের সহ্য করতে হবে।’

সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছেন বলে মনে করেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। গত শনিবারও তিনি ইরানকে উদ্দেশ করে টুইটারে একাধিক উসকানিমূলক পোস্ট দেন। এর মধ্যে একটিতে তিনি লিখেছেন, তেহরান হামলা চালালে ইরানের ৫২টি স্থানে হামলা চালানো হবে। ট্রাম্প প্রতীকী অর্থে ৫২ সংখ্যাটি ব্যবহার করেছেন। ১৯৭৯ সালে তেহরানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ৫২ মার্কিন কূটনীতিককে জিম্মি করেছিল ইরান।

টুইটারে ট্রাম্প লিখেছেন, এই ৫২টি স্থাপনার মধ্যে ‘এমন অনেক কিছু আছে, যেগুলো ইরান ও ইরানের সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোতে খুবই দ্রুত এবং খুবই জোরে আঘাত হানা হবে। যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো হুমকি শুনতে চায় না।’ শনিবার রাতেই ট্রাম্প আরেকটি টুইট করেন। সেখানে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘ইরানে এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হবে, যে হামলার মুখে কখনো তারা পড়েনি।’ একই রাতে আরেকটি টুইটে তিনি লেখেন, ‘ইরান প্রতিশোধ নিলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সবচেয়ে সুন্দর ও আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করবে না।’

শনিবার রাতে ইরাকে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে কয়েক দফা রকেট হামলার পর ট্রাম্প টুইটারে এসব মন্তব্য করেন। তবে ওই হামলার দায় কোনো সংগঠন স্বীকার করেনি। কেউ হতাহত হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে।

ট্রাম্পের টুইট বার্তার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আবদোলরহিম মোওসাভি বলেছেন, ‘যুদ্ধে জড়ানোর মতো মনোবল আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের আছে কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।’

সোলাইমানির মৃত্যুতে ইরানের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে শনিবার কোম শহরের জামকারান মসজিদে উত্তোলন করা হয় লাল রঙের পতাকা। পতাকা উত্তোলনের মুহূর্তটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। ইরানের ইতিহাসে এই প্রথম লাল পতাকা উত্তোলন করা হলো। শিয়াদের কাছে লাল পতাকা মূলত রক্ত ও প্রতিশোধের (কোনো শহীদের জন্য) অর্থ বহন করে। শিয়াদের বিশ্বাস অনুসারে, ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন শহীদ হওয়ার পর লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা আজও নামানো হয়নি। ইমাম হুসাইনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হলেই কেবল ওই পতাকা নামানো হবে।

এদিকে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। এর মধ্যে হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ করে দুই শতাধিক মানুষ। তাদের অনেকেই স্লোগান দেয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে সরে আসতে হবে’। এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা নিজেদের মাতৃভূমিকে আর কোনো হঠকারী যুদ্ধে লিপ্ত হতে দেব না।’ যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে জার্মানি, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরেও।

মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সোলাইমানিকে হত্যার বিষয়ে কংগ্রেসকে ট্রাম্প যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা বিভিন্ন কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। ট্রাম্প প্রশাসনের উসকানিমূলক ও খামখেয়ালি সামরিক তৎপরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও মিত্ররা হুমকির মধ্যে পড়ে গেছে।’

অনেকেই মনে করেন, সোলাইমানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইরাকে এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার মনে করেন, দুই দেশ সরাসরি যুদ্ধেই লিপ্ত হয়ে গেছে। নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের গবেষক ইরিকা গ্যাসটোন বলেন, ‘এখন আর ছায়াযুদ্ধ বলার সুযোগ নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ জেনারেলকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে ইরানের প্রতি অনুগত গোষ্ঠীগুলো সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইরাকে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে দিয়েছে।’

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাবেদ জারিফকে ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গতকাল টেলিফোনে জাবেদকে এই আমন্ত্রণ জানান ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল।

এদিকে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইরান। গতকাল রাতে বৈঠকটি হওয়ার কথা। ধারণা করা হচ্ছে, চুক্তিটি না মানার পক্ষে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। ২০১৮ সালে ওই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র।

সূত্র : এএফপি, টাইমস অব ইন্ডিয়া।

আরো পড়ুন

ভারতে করোনায় মৃত ৫৩, আক্রান্ত ২০৬৯, সুস্থ ১৫৬

‘এবিপি নিউজ’ হিন্দি টিভি চ্যানেলের ওয়েবসাইটে অবশ্য আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৫৪৩, মৃত ৫৩ এবং …