বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ চলছে। কিন্তু আলোচনার মাঝেই দেখা দিয়েছে এক ধরনের ভুল ধারণা, যা আইন প্রণয়নের সঠিক পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। মূল বিতর্ক ঘিরে আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর ৫.৩ অনুচ্ছেদকে ঘিরে। জনস্বাস্থ্যকে অযাচিত প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি এ অনুচ্ছেদকে কেউ কেউ এমনভাবে ব্যাখ্যা করছেন, যেন তামাক শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যেকোনো যোগাযোগই অপরাধ। অথচ বাস্তবে এতে যোগাযোগ নিষিদ্ধ নয়, বরং তা হতে হবে স্বচ্ছ ও নথিভুক্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষায় ভুল ব্যাখ্যা নয়, বরং প্রয়োজন স্বচ্ছ আলোচনাভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ।
অতীতের উদাহরণ থেকে দেখা যায়— ২০০৫ ও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকারও শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করেছে। সংলাপের মাধ্যমে কার্যকর নীতি তৈরি সম্ভব, যা আইনকে বাস্তবসম্মত ও প্রভাবশালী করে তোলে।
খসড়া আইনের কিছু প্রস্তাবনা সরাসরি অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে- খুচরা বিক্রেতাদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা, যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। সিগারেট শলাকা আকারে বিক্রি বন্ধ করা নিম্ন আয়ের মানুষ ও ছোট দোকানদারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিছু উপাদানে বিধিনিষেধ আরোপ হলে বৈধ উৎপাদন বাধাগ্রস্থ হবে এবং জাতীয় রাজস্বে আঘাত আসবে।সব ধরনের প্রভাব বিশ্লেষণ ছাড়া বা খাত সংশ্লিষ্টদের মতামত ছাড়া আইন প্রণয়ন করলে, বাজারে বৈধ ব্যবসা দুর্বল হবে, অবৈধ কালোবাজার ও অপরাধ গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ভোক্তা অবৈধ পণ্যের দিকে ঝুঁকবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও ক্ষতিকর।
নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সম্পূর্ণ বাদ দিলে আইন বাস্তবায়ন দুর্বল হয়ে পড়ে। যখন ছোট ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা বা উৎপাদকদের মতামত নেওয়া হয় না, তখন তারা নতুন নিয়ম মানতে আগ্রহ হারাবে এবং এর ফলে সরকারের প্রতি আস্থাও কমে আসবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে, যেখানে সবার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়।
সংশ্লিষ্টদের চাওয়া, নীতিনির্ধারকদের এই আইন সংস্কারের সময় শিল্পসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবে। শিল্পসহ সব পক্ষের সঙ্গে পরামর্শের ক্ষেত্রে কোনো আপস নয়, বরং এটি এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা জনস্বাস্থ্য নীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুটোকেই শক্তিশালী করবে। শেষ পর্যন্ত, ৫.৩ অনুচ্ছেদ সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলে স্বচ্ছতা, অন্তর্ভুক্তি এবং সংলাপের পক্ষেই কথা বলে। এটি আইন প্রণয়নকে বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং টেকসই করে তোলে।

