অর্থনিতি

নতুন ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ ৭৭৬৯৬ কোটি টাকা

বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য গেল অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার যে পরিমাণ নিট ঋণ নিয়েছে, তার ৭৭ শতাংশই ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৭ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা, যা নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকারকে সরবরাহ করা হয়। এটি তার আগের অর্থবছরের চেয়ে পৌনে তিনগুণ বেশি। অর্থাৎ সরকারকে ঋণ দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পক্ষে ডিভলভমেন্ট করে এই পরিমাণ ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর টাকা ছাপিয়ে সরকারকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ দেওয়ার বড় প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে। যদিও সমালোচনার মুখে চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর থেকে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া মানেই হচ্ছে নতুন ছাপানো টাকা সরবরাহ করা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা বাজারে গেলে পরবর্তী সময়ে এই টাকার পরিমাণ পাঁচগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। আর সেটার প্রভাবও বাস্তবে দেখা গেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ২০২৩ সালজুড়েই মূল্যস্ফীতির চাপে ছিল সাধারণ মানুষ। বিবিএসের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। আর গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি উঠেছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা ১৩৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এর আগে ২০১২ সালের মার্চে ১০ দশমিক ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। এরপর আর কখনো মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে যায়নি।

সাধারণত সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বেশিরভাগ বিনিয়োগ করে থাকে পিডি ব্যাংক ও নন-পিডি ব্যাংক। তবে বিদায়ী অর্থবছরে সেই চিত্র পাল্টে যায়। সরকারের ব্যাংকঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়ে। মূলত তারল্য সংকটের কারণে সরকারের ঋণ চাহিদা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মেটাতে পারেনি। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার কেনার কারণে টাকা বাজার থেকে উঠে যায়। এ ছাড়া কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের অনিয়মের খবর প্রকাশ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে নগদ টাকা তুলে নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে নতুন আমানত আসাও কমে যায়। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও

আগের বিতরণ হওয়া ঋণও সময়মতো ফেরত আসেনি। এ কারণে সরকারকে ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে অনেক ব্যাংক। আবার দিলেও বেশি সুদ দাবি করা হয়। তাই বাধ্য হয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পক্ষে বিল-বন্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনে নিয়ে সরকারকে ঋণ সরবরাহ করে।

গতকাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের ওপর বাংলাদেশ গভর্মেন্ট সিকিউরিটিস সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গেল অর্থবছরে সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডে যে পরিমাণ নিট বিনিয়োগ হয়েছে, তার ৭৭ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৭৭ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। বাকি ৩৩ শতাংশেরও কম নিট বিনিয়োগ করেছে পিডি ও নন-পিডি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যরা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৭৬৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার ২৯৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ফলে গেল অর্থবছরে বিল-বন্ডে বিনিয়োগ বেড়েছে ১ লাখ ৪৬৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বা ২৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ এই পরিমাণ টাকা ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ হিসেবে নিতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছর সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের ১ লাখ ৪৬৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বিনিয়োগের ৭৭ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের, যা মোট বিনিয়োগের ৭৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অথচ আগের অর্থবছরে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের ৭০ হাজার ১১১ কোটি টাকার বিনিয়োগের মধ্যে ২৮ হাজার ৯৭ কোটি টাকা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের, যা ওই অর্থবছরের মোট বিনিয়োগের ৪০ শতাংশ। মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকের পক্ষে সরকারের বিল-বন্ডের সিংহভাগ কেনার কারণে গেল অর্থবছরে বিল-বন্ডে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থিতি ব্যাপকহারে বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে ট্রেজারি বিল-বন্ডে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ৫৩ হাজার ১৯৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা মোট বিনিয়োগের ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ ছিল। গেল অর্থবছর বিনিয়োগ বেড়ে স্থিতি দাঁড়ায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়, যা মোট বিনিয়োগের ২৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

এদিকে গেল অর্থবছরে পিডি ও নন-পিডি ব্যাংকের বিনিয়োগ তেমন বাড়েনি। কারণ তারল্য সংকট থাকার কারণে ট্রেজারি বিল-বন্ড ম্যাচিউর্ড হওয়ার পর নতুন করে বিনিয়োগ করেনি। যার কারণে পরিমাণগত বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও শতাংশ হারে কমেছে। বর্তমানে ২৪টি প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ও ২৪টি নন প্রাইমারি ডিলার (নন-পিডি) ব্যাংক রয়েছে দেশে। তবে এখনো বিল ও বন্ডে পিডি ব্যাংকের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি রয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে পিডি ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা মোট বিনিয়োগের ৪৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গেল অর্থবছর স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা মোট বিনিয়োগের ৩৬ দশমিক ৬২ শতাংশ।

অপরদিকে গেল অর্থবছর নন-পিডি ব্যাংকের বিনিয়োগ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ২২৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা মোট বিনিয়োগের ২৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে স্থিতি ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বা ৩০ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪৮ কোটি টাকা, যা মোট বিনিয়োগের শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ। আমানত বীমা ট্রাস্টের বিনিয়োগ রয়েছে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ, সাধারণ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ, করপোরেট সংস্থার ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ, বিনিয়োগ কোম্পানির শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ, প্রভিডেন্ট/পেনশন/ট্রাস্ট ও গ্র্যাচুইট তহবিলের ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ডের শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ রয়েছে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ পরিমাণ ও শতাংশের দুই দিক দিয়েই কমেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছর ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ স্থিতি কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০২ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছর ছিল ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা বা শূন্য ৩৩ শতাংশ।