রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯

‘তুমি কি জানো- আমি কে?’

বিষয়টি বহুকালের পুরনো এবং চিরন্তন সত্য। স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিভিন্নভাবে এবং ভিন্ন ভিন্ন উপাখ্যানে বিষয়টি বিভিন্ন সুর-তাল-লয় এবং ছন্দে উচ্চারিত হয়ে আসছে অনাদিকাল ধরে। বিষয়টিকে কৌতুকাকারে প্রথম শুনি সাধকগুরু নামের ভারতের প্রখ্যাত একজন যোগীর কাছ থেকে, যিনি সাম্প্রতিককালে কেবল ভারত নয়- তামাম দুনিয়াতেই বেশ আলোচিত এবং যথেষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি আবার কৌতুকটি শুনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। এর বিষয়বস্তু নিয়ে ইদানীং বাংলাদেশের একটি নামকরা চা কোম্পানি বিজ্ঞাপন তৈরি করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করে চলেছে। আজ আমরা প্রথমে কৌতুকটি বলব এবং পরে কৌতুকের অন্তর্নিহিত বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করব।

মানবজাতির ইতিহাসে প্রায় সব রূপবান ও রূপবতী তাদের রূপ-লাবণ্য লোকজনকে দেখানোর জন্য এবং তা সর্বসাধারণ্যে প্রচার-প্রসারের জন্য যে উন্মত্ততা দেখিয়েছে, তার কলঙ্কজনক অধ্যায়গুলো অনেক সময় ইতিহাসের চাকাকে উল্টোপথে ঘুরিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতাবানেরা ক্ষমতার দম্ভ, বিত্তবানেরা অর্থবিত্তের তাণ্ডব এবং স্বার্থপর লোভী ও অযোগ্য চাটুকাররা শব্দসন্ত্রাস এবং পদলেহনের যে প্রহসনমূলক গীতিকাব্য মঞ্চায়ন করেছে, তার কারণে দুনিয়াতে খোদায়ি গজব অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। এ নিবন্ধে যে কৌতুকটির কথা বলা হবে তার মর্মকথা হলো, অমিত্ববাদের ধ্বংসাত্মক দিক। মানুষেরা প্রায়ই নিজের গুরুত্ব বোঝানো অথবা নিজের দম্ভ প্রকাশ করার জন্য তাদের আশপাশের লোককে জিজ্ঞেস করে- তুমি জানো! আমি কে?’ এমন কি কেউ কেউ বলেন, আমি ইচ্ছে করলে তোমাকে চিবিয়ে গিলে খেতে পারি; কেউ বা আরো একটু বাড়িয়ে আস্ত গিলে খাওয়া অথবা লবণ ও কাঁচামরিচ দিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলার হুমকিও দিয়ে থাকেন।

আমার শৈশবে বাচ্চু খাঁ নামের একজন প্রভাবশালী গ্রাম্য মাতব্বরকে চিনতাম, যিনি কথায় কথায় বলতেন- লাত্থি দিয়ে ফাটায় দেবো। তার মতো অনেক স্বামী-স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজ বুকে চপেটাঘাত করে বলতেন, একটা লাত্থি দিয়ে তোরে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো। তবে মুখরা স্ত্রী হলে দাম্ভিক স্বামীকে একটুও ছাড় দিতেন না। সদম্ভে চেঁচিয়ে বলতেন, ‘মিনসের কথা শুনলে ঘেন্নায় উটকি (বমি) আসে। প্যাটে ভাত নাই পরনে কাপড় নাই; মাথাটা নোনো কাঠি; ঠ্যাং দুুইহ্যান জালোকাঠি; হ্যায় আবার আমারে লাত্থি মারব…।’ স্বামী-স্ত্রীর আমিত্ববাদের দহন হয়তো কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু কোনো প্রভাবশালী রাজা-বাদশাহ, আমির-ওমরাহ, সেনাপতি কিংবা কোতোয়ালকে যদি এ রোগে পেয়ে বসে; তবে সংশ্লিষ্ট দেশ-জাতির মাটি ও মানুষ জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে।

আমিত্ববাদের বিরুদ্ধে মহাকালের সব মহামানবই কথা বলেছেন। তাদের সেসব অমিয় বাণীর মধ্যে মহামতি সক্রেটিসের বক্তব্যটি নানা কারণে বেশ আলোচিত। আমিত্ববাদ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তিনি বলেছেন- ‘নিজেকে চেনো’। মানুষ তার স্বভাব দোষে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজেকে চেনা বা নিজেকে জানার চেষ্টা বাদ দিয়ে উল্টো কাজ করে থাকে। তারা প্রায়ই নিজেকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে এবং সেই ফোলানো-ফাঁপানো বেলুনে বাহারি রঙচঙ মাখিয়ে তা আকাশে উড়িয়ে দেয়। তারা চায় লোকজন তাদেরকে দেখুক এবং তাদের রঙিন ফানুসরূপী ভাসমান ও টলটলায়মান অবস্থা দেখে জয়ধ্বনি তুলে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলুক।

মানুষের আমিত্ববাদের মন্দ দিক বুঝাতে গিয়েই ভারতীয় সাধকগুরু আলোচ্য কৌতুকটি বলেছিলেন। কোনো এক বিমানবন্দরে জনৈক হোমরা-চোমরা টাইপের এক লোক নিজের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য বিমানের কাউন্টারে কর্মরত মেয়েটিকে প্রশ্ন করল, এই মেয়ে! তুমি কি জানো, আমি কে? মেয়েটি কালবিলম্ব না করে বিমানবন্দরের লাউড স্পিকারে ঘোষণা দিয়ে বলল- ‘ওমুক বিমান কোম্পানির কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো একটি লোকের স্মৃতিভ্রম ঘটেছে, তিনি নিজেকে চিনতে পারছেন না। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাকে চেনেন অথবা তার পরিচয় সম্পর্কে জানেন, দয়া করে অসহায় লোকটির স্মৃতি ফিরে পেতে সাহায্য করুন; তাকে তার আপনজন বা আপন আলয়ে পৌঁছে দিতে সাহায্য করুন।’

এ কৌতুকের মতো শত-সহস্র ঘটনা আমাদের চারপাশে হররোজ ঘটে, কিন্তু আমরা কেউই বিমান কোম্পানির কাউন্টারে কর্মরত মেয়েটির মতো সাহস ও বুদ্ধিমত্তা দেখিয়ে ফুলানো-ফাঁপানো রঙিন বেলুনগুলোর বায়ু নিঃসরণ ঘটিয়ে সেগুলোর ভাসমান অবস্থার যবনিকা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারছি না। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ভারতীয় সাধকগুরু বলেছিলেন, মানুষের উচিত অন্যকে জিজ্ঞেস না করে নিজেকেই জিজ্ঞেস করা- আমি কে? মানুষ যখন যার যার অবস্থান থেকে নিজেকে চেনার বা নিজেকে জানার প্রাণান্ত চেষ্টা করে এবং আমি কে- এমন প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য অন্যের কাছে ধরনা না দিয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করে এবং মস্তিষ্কের ওপর বিচারের ভার দেয়, তখন বেশির ভাগ সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, নিজেকে কী করে চেনা সম্ভব অথবা নিজেকে চেনার সহজ সরল পদ্ধতিগুলো কী? কোনো মানুষ যদি নিজেকে চিনতে চায়, তবে অবশ্যই তাকে মানব প্রকৌশল বা হিউম্যান ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে কমবেশি ধারণা লাভ করতে হবে। মানুষের শরীরের গঠন, রক্ত, অস্থিমজ্জার প্রকৃতি, বংশ, প্রতিবেশ-পরিবেশ এবং চিন্তা-চেতনা শিক্ষাদীক্ষাকে যদি একেকটি উপাখ্যানরূপে বিবেচনা করি, তবে শরীরের জন্য সিভিল, মেকানিক্যাল, কেমিক্যাল ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। বংশ-পরিবেশ মূল্যায়ন করার জন্য সামাজিক বিজ্ঞান-দর্শনশাস্ত্র ইত্যাদি মূল্যায়ন করার জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষাদীক্ষা-জ্ঞানবুদ্ধি পরিমাপের জন্য অঙ্ক, সংখ্যাতত্ত্ব, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংক্রান্ত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং জানতে হবে। কেউ যদি রূপ-লাবণ্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে চান, তাকে স্থাপত্যবিদ্যার প্রকৌশল, ফ্যাশন ও ডার্মাটোলজির ইঞ্জিনিয়ারিং জানতে হবে। এর বাইরে ডাক্তারি বিদ্যা, মনোবিজ্ঞান, ভারসাম্যসংক্রান্ত বিজ্ঞান, চৌম্বক বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্যব্যবস্থাপনার জ্ঞানসহ হাজারো রকম বিদ্যাবুদ্ধি না থাকলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ যদি নিজেকে চেনার জন্য জিজ্ঞেস করেন- ওহে মন, বল তো আমি কে? তবে তা অন্ধ পিঁপড়ার হস্তী দর্শনের ঘটনার চেয়ে আলাদা কিছু হবে না।

বিশ্বজাহানে সাধারণত দুই ধরনের প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিং রয়েছে। একটি হলো, মনুষ্য নির্মিত ইঞ্জিনিয়ারিং আর অন্যটি হলো বিধাতাসৃষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের মন-মস্তিষ্ক বিধাতার ইঞ্জিনিয়ারিং তো দূরের কথা- মানুষের তৈরি অনেক প্রকৌশল দেখেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। মানুষের অনেক স্থাপত্য, যা তৈরি হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে তার অনেক কিছুই বর্তমান যুগের মানুষ শতচেষ্টা করেও বুঝতে পারছে না। অন্য দিকে, বিধাতার নির্মাণশৈলীর রহস্যভেদ করা দূরের কথা, তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি সৃষ্টির সামান্য অণু-পরমাণু বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অথবা লতাপাতার শিরা-উপশিরার রহস্যও ভেদ করা সম্ভব হয়নি। কাজেই বিশ্বজাহানের সবচেয়ে নিখুঁত, সবচেয়ে অনুপম এবং বিস্ময়কর ইঞ্জিনিয়ারিং তথা মানুষ সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করার শুদ্ধ গাইডলাইন না পড়লে বা না জানলে বস্তুটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতে পারব না।

প্রশ্ন করা যেতে পারে, মানুষ চেনার গাইডলাইন অথবা নিজেকে চেনার গাইড লাইনই বা কী? উত্তর খুবই সহজ- অর্থাৎ দুনিয়ার কোনো যন্ত্র সম্পর্কে আমরা যদি ধারণা লাভ করতে চাই, তবে অবশ্যই যন্ত্রটির নির্মাতা যে ম্যানুয়াল বা গাইডলাইন দিয়ে থাকেন তা অনুসরণ করতে হবে। যন্ত্রটির জন্য কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ বা কোন পরিবেশে যন্ত্রটি কেমন কর্মক্ষম হবে অথবা যন্ত্রটির জন্য উত্তম জ্বালানি এবং যন্ত্রের বিশ্রাম, যতœ-আত্তি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে অবশ্যই যন্ত্রের নির্মাণকারী কর্তৃক সরবরাহকৃত গাইডলাইনটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে এবং নির্ভুলভাবে তা অনুসরণ করতে হবে। একইভাবে মানুষের সৃষ্টিকর্তার গাইড লাইন ছাড়া আমরা কেউই বলতে পারব না, কোনটি আমাদের জন্য সঠিক এবং কোনটি বেঠিক। নিম্নের উদাহরণটি পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ধরুন, আপনি কোনো ডাকাতকে বললেন, ডাকাতি খারাপ। তখন সে আপনাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ দিয়ে জানতে চাইল, আচ্ছা বলুন তো সে কেন আমার জন্য খারাপ? একইভাবে ধর্ষণকারী, জুলুমবাজ, সন্ত্রাসী, লুটেরা ও ঘুষখোরেরা আপনাকে বলতে থাকল, ‘আপনি যেটাকে অপকর্ম বলছেন, আমাদের মতে সেটির মতো সুকর্ম নেই। আমি শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে ডাকাতি করি; অন্যের ধন হরণ করে মজা পাই এবং বিত্তবিলাসে জীবন কাটাই। ধনসম্পদ উপার্জনের জন্য আমাকে কিছুই করতে হয় না। ডাকাতি করতে গিয়ে যে কৌশল অবলম্বন করি তাতে আমার কোনো ক্ষতি হয় না। প্রভাবশালীদের ডাকাতির অর্থের ভাগ দেই এবং তাদের ভাই-বেরাদার ও আত্মীয়স্বজনের মতো তাদের সাথে এমনভাবে মিলে মিশে থাকি যে, সাধারণ মানুষ আমাকে ডাকাতের পরিবর্তে সাধু-সন্ন্যাসী বলে সমীহ করতে বাধ্য হয়।’

ডাকাতদের মতো অন্যরাও তাদের নিজের কর্মের সুফল সম্পর্কে বহু কথা বলার পর বলল, আমাদের কর্ম দ্বারা যদি অন্যের ক্ষতি হয় তবে আমাদের কী? আমাদের নিজেদের তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। আমরা কেবল আমাদের লাভ-ক্ষতির কথা ভাবব। সার্বিক বিবেচনায় নিজেদের জন্য যেটি মঙ্গলজনক, উপভোগ্য, সুবিধাজনক এবং বেশি লাভজনক সেটিই করব। অন্যের কথা চিন্তা করে আমাদের যেমন কোনো লাভ নেই, তেমনি দরকারও নেই। তারা আরো বলল, মানুষের হাহাকার দেখলে নাকি তাদের উল্লাস করতে ইচ্ছে হয়। মানুষের মৃত্যু, আহাজারি আর রক্ত দেখলে তাদের কর্মস্পৃহা বেড়ে যায় এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রবল আকার ধারণ করে। মানুষের অসহায়ত্ব, আর্তচিৎকার এবং জ্বালা-যন্ত্রণা তাদের ভোগ ও কামশক্তিকে নিদারুণভাবে বাড়িয়ে দেয়। ফলে তারা সারাক্ষণ ফন্দি-ফিকির করতে থাকে কী করে নিজেদের কর্মের অধিক্ষেত্র বিস্তৃত করা যায়।

আপনি যদি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও মতাদর্শের লোকজনকে জিজ্ঞেস করেন এবং তারা যদি চরম আত্মকেন্দ্রিক হন, তবে তাদের জবাবগুলো ডাকাতদের আত্মকেন্দ্রিক জবাবের চেয়ে ভিন্ন হবে না। পৃথিবীর মানুষ কেবল তাদের সৃষ্টিকর্তার গাইড লাইন মান্য করলেই তারা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেবে যে, চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি ইত্যাদি খারাপ এবং অহমিকাবোধ, দাম্ভিকতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাও খারাপ।

আরেকটি উপায়ে মানুষ আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে পারে। তা হলো- নিজেকে জানা এবং নিজেকে বুঝা। কিন্তু মানুষের পক্ষে হিউম্যান ইঞ্জিনিয়ারিং তথা মানুষের মানবিক ও শারীরিক যন্ত্রকৌশল সম্পর্কে একজনমে বিলিয়ন-বিলিয়ন-বিলিয়ন ভাগের এক ভাগও অর্জন করা সম্ভব নয়। তাহলে তারা নিজেদের কিভাবে চিনবে? এ ব্যাপারেও জ্ঞানী-বিজ্ঞানী ও মহাজনেরা বহু উদাহরণ রেখে গেছেন। একটি কাহিনী থেকে আপনারা নিজেকে চেনার সহজ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। সক্রেটিসের জীবদ্দশায় গ্রিসে ডেলফির মন্দির বিস্ময়করভাবে দুনিয়াব্যাপী প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল নানা কারণে। মন্দিরের যিনি প্রধান পুরোহিত ছিলেন; তিনি ও অন্য পুরোহিতরা দর্শনার্থীদের বিভিন্ন জটিল ও কঠিন প্রশ্নের সহজ-সরল ও গ্রহণযোগ্য উত্তর দিয়ে লোকজনকে মোহিত করে তুলতেন।

তারা বিভিন্ন বিষয়ে আগাম পূর্বাভাস দিতেন এবং প্রায় নির্ভুলভাবে ভবিষ্যৎ গণনা করতেন। একবার গ্রিসের একদল জ্ঞানীগুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তি ডেলফির মন্দিরে বহু লোকজন নিয়ে সমবেত হলেন। তারা পুরোহিতের নিকট জানতে চাইলেন- গ্রিসের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তির নাম কী? পুরোহিত একবাক্যে সক্রেটিসের নাম বলে দিলেন। লোকজন এবার সদলবলে সক্রেটিসের কাছে গেলেন এবং তার অগাধ পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানগরিমার রহস্য জানতে চাইলেন। সক্রেটিস মৃদু হেসে বললেন, ‘কেন মন্দিরের পুরোহিত আমাকে জ্ঞানী বলেছেন তা জানি না। আমি জ্ঞানী নাকি বোকা সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। আসলে আমি ওসব নিয়ে কখনো চিন্তাই করিনি। তবে একটি বিষয়ে আমি সব সময় জানার চেষ্টা করেছি; আর তা হলো আমি কী কী বিষয় জানি না।’

সক্রেটিসের মতো প্রায় একইভাবে নিজের জ্ঞান সম্পর্কে বলে গেছেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন। জ্ঞানী ও নির্বোধের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে একজন নামকরা কবি বলেছেন- জ্ঞানীরা জানেন যে, তারা জানেন না; অন্য দিকে নির্বোধেরা জানে না যে, ‘তারা জানে না।’ কাজেই মানুষ যদি নিজের জ্ঞানগরিমার সীমাটুকু বুঝতে পারে, তবেই সে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। আর আত্মকেন্দ্রিকতামুক্ত হলে নিজের কর্মের অধিক্ষেত্র সে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে মানুষ তখন কাউকে লক্ষ্য করে বলে না, ‘তুমি জানো- আমি কে?’ বরং সে একান্তে আপনমনে নীরবে-নির্জনে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করে, আমি কে? কোথা থেকে এলাম? কেন এলাম? কিসের জন্য এলাম? কোথায় যাবো? কিভাবে যাবো এবং কখন যাবো?

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

উৎসঃ   নয়াদিগন্ত

আরো পড়ুন

নির্বাচনে বঞ্চিতদের প্রতিক্রিয়া

আগের থেকেই জানিয়ে রেখেছিলাম, এবারের সংসদ নির্বাচন নিয়ে তিনটা, চারটা বা পাঁচটা কলাম লিখব। প্রথম …