আন্তর্জাতিক

গাজায় একসঙ্গে ৪ সন্তানের জন্ম দিলেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি মা

গাজায় একসঙ্গে ৪ সন্তানের জন্ম দিলেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি মা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে টানা আড়াই মাস ধরে অবিরাম হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। স্কুল, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জার পাশাপাশি হামলা হচ্ছে সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘরেও। এতে করে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি।

আর এমন অবস্থায়ই গাজায় একসঙ্গে ৪ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন বাস্তুচ্যুত এক ফিলিস্তিনি মা। তার নাম ইমান আল-মাসরি। ২৮ বছর বয়সী এই মায়ের জন্ম দেওয়া এই শিশুদের দুজন মেয়ে এবং দুজন ছেলে। তবে তাদের মধ্যে এক ছেলে শিশুকে হাসপাতালে রাখতে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৮ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের উত্তরে নিজে বাড়ি থেকে দূরে দক্ষিণ গাজার একটি হাসপাতালে চার সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর ইমান আল-মাসরি অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের মধ্যে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এই ফিলিস্তিনি মা নিরাপত্তার জন্য তার আরও তিন সন্তানের সাথে পায়ে হেঁটে বেইট হানুনে তার বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। সেসময় তারা পাঁচ কিলোমিটার (তিন মাইল) হেঁটে জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলেন।

তবে সেখান থেকে আরও দক্ষিণে অবস্থিত দেইর আল-বালাহতে যেতে তারা পরিবহনের জন্য কিছু একটা উপায় খুঁজছিলেন। কারণ ইমান তখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং তার জন্য এই ‘দূরত্ব ছিল অনেক দীর্ঘ’।

২৮ বছর বয়সী এই বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি মা গত ১৮ ডিসেম্বর সি-সেকশনের মাধ্যমে কন্যা টিয়া ও লিন এবং ছেলে ইয়াসির ও মোহাম্মদ নামে চার শিশুর জন্ম দেন। কিন্তু যুদ্ধের অন্যান্য রোগীদের জন্য জায়গা করে দিতে ইমানকে বেশ দ্রুতই নবজাতকদের নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যেতে বলা হয়।

তবে শিশু মোহাম্মদকে ছাড়াই তাকে হাসপাতাল ছাড়তে হয়। কারণ সে তখন খুবই নাজুক ছিল। এখন টিয়া, লিন এবং ইয়াসিরকে নিয়ে এই দম্পতি তাদের বর্ধিত পরিবারের প্রায় ৫০ জন সদস্যের সাথে দেইর আল-বালাহতে একটি ছোট স্কুলরুমে আশ্রয় নিয়েছেন।

নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের একটি হাসপাতালে রেখে আসা শিশু সন্তানের বিষয়ে মা ইমান আল-মাসরি বলেন, ‘মোহাম্মদের ওজন মাত্র এক কিলোগ্রাম (২.২ পাউন্ড)। সে (এখানে) বাঁচতে পারবে না।’

আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়া স্কুলরুমের একটি ফোমের গদিতে শুয়ে ইমান সংঘাতের শুরু থেকে তার দুর্ভোগের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাড়ি ছেড়েছিলাম, তখন বাচ্চাদের জন্য আমার কাছে শুধু কিছু গ্রীষ্মের পোশাক ছিল। আমি ভেবেছিলাম যুদ্ধ এক বা দুই সপ্তাহ স্থায়ী হবে এবং তারপরে আমরা বাড়িতে ফিরে যাব।’

তবে সংঘাতের ১১ সপ্তাহেরও বেশি সময় পরে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার তার আশা ভেঙে গেছে।

আল জাজিরা বলছে, ইসরায়েলি আগ্রাসনের জেরে ২৪ লাখ মানুষের বাসস্থান গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, যুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

আর গত ৭ অক্টোবর থেকেই গাজায় ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভূখণ্ডটিতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। নিহতদের মধ্যে ১৫ হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু।

আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৫৫ হাজার ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলের এই হামলা থেকে বাদ যাচ্ছে না গাজার কোনও অবকাঠামো। তারা মসজিদ, গির্জা, স্কুল, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবিরসহ বেসামরিক মানুষের বাড়ি-ঘর সব জায়গায় হামলা চালিয়ে আসছে।

‘অসহায়’

বাস্তুচ্যুত এই ফিলিস্তিনি মা একসঙ্গে ৪ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ১০ দিন আগে। ইমান বলছেন, অন্যান্য মায়েদের মতো তিনিও ঐতিহ্য অনুসরণ করার এবং ‘গোলাপজল দিয়ে’ তার সন্তানদের জন্মগ্রহণকে উদযাপন করার আশা করেছিলেন।

কিন্তু ১০ দিন পরে এসেও নিজের এই শিশু সন্তানদের এখানও গোসল করাতেও পারেননি ইমান। তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানি খুঁজে পাওয়াটাই এখন দুষ্কর। এখানে দুধ, ওষুধ এবং ডায়াপারের মতো স্বাস্থ্যকর পণ্য সরবরাহ-সহ মৌলিক খাদ্য সামগ্রীর মারাত্মক সংকট রয়েছে।

ইমান বলেন, ‘সাধারণত, আমি প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তন করতাম। কিন্তু এখন পরিস্থিতি কঠিন এবং আমাকে অবশ্যই মিতব্যয়ী হতে হবে। নবজাতকরা সকালে একটি তাজা ডায়াপার পায় এবং সন্ধ্যায় পায় আরেকটি ডায়াপার।’

ইমান আল-মাসরির স্বামীর নাম আম্মার আল-মাসরি। ৩৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বলছেন, তিনি তার পরিবারের ভরণপোষণ দিতে পারছেন না, আর এই কারণে তিনি বিধ্বস্ত। দুর্গন্ধযুক্ত স্কুলরুমে নিজের ছয় সন্তানকে নিয়ে তিনি বলছেন, ‘আমি অসহায় বোধ করছি।’

আম্মার আল-মাসরি তার দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে খাবারের সন্ধানে কাটান। তিনি বলছেন, ‘আমি আমার সন্তানদের জন্য ভয় পাই। আমি জানি না কিভাবে তাদের রক্ষা করা যায়।’

তার ভাষায়, ‘(জন্ডিসে আক্রান্ত) টিয়াকে অবশ্যই বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং আমার স্ত্রীর প্রোটিনযুক্ত পুষ্টিকর খাবার দরকার। বাচ্চাদের দুধ এবং ডায়াপার দরকার। কিন্তু আমি এর কিছুই তাদের দিতে পারছি না।’