সোমবার, ৮ মার্চ ২০২১
হোম » ইসলাম » ইসলামী সভ্যতায় মানবাধিকার চর্চা
ইসলামী সভ্যতায় মানবাধিকার চর্চা

ইসলামী সভ্যতায় মানবাধিকার চর্চা

ইসলাম মানব সভ্যতাকে অফুরান সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সাগরে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের উত্তম জীবিকা দান করেছি, আর আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭০)

মানবতার প্রতি ইসলামের এই দৃষ্টিভঙ্গিই একে অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মানবতাবাদী জীবনবিধানে রূপান্তর করেছে। ইসলাম সর্বত্র তা বাস্তবায়নেরও জোর তাকিদ দিয়েছে। এ মূল্যবোধ বিনষ্ট করার ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি। কারণ এটি বিশ্বজগতের নিয়ন্তা মহান স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) মানবাধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, হে মানব সম্প্রদায়,  আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর যেমন পবিত্র তোমাদের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু, কেয়ামত পর্যন্ত এমনই পবিত্র। (সহিহ বুখারি)

 

জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা : মহানবী (সা.) ঐতিহাসিক ভাষণে মানুষের জান-মাল এবং জীবনের নিরাপত্তার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে হাদিসে উম্মতকে নিজের জীবন সংরক্ষণের প্রতিও বিশেষ তাকিদ দেওয়া হয়েছে এবং আত্মহত্যাকে হারাম ঘোষণা করেছে। আত্মহত্যার ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে হত্যা করে, সে জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ওইভাবে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে, যে ব্যক্তি বিষ পান করে আত্মহত্যা করে, সেও জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ওইভাবে নিজ হাতে বিষ পান করতে থাকবে, আর যে কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করে, তার কাছে জাহান্নামে সেই ধারালো অস্ত্র থাকবে, যা দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেট ফুঁড়তে থাকবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

এভাবে মানবাধিকার বিপন্নকারী যেকোনো কর্ম থেকে ইসলাম বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। এ জন্যই অন্যায়ভাবে কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, লাঞ্ছনা অথবা প্রহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ। হিশাম ইবনে হাকিম বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যারা দুনিয়ায় মানুষকে কষ্ট দেয়, অবশ্যই আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন। (ইবনে হিব্বান)

 

সবার জন্য সমান অধিকার : ইসলাম সবার জন্য সম-অধিকার নিশ্চিত করেছে। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন পর্যন্ত বিচারক ও বিচারপ্রার্থী, শাসক ও শাসিত কারো মধ্যেই আলাদা ও পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের কথা ইসলাম বলেনি। এমনকি অনারবের ওপর আরবের, কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। ইসলামে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে মানব সম্প্রদায়, তোমাদের পিতা একজন। তোমরা সবাই আদম-সন্তান আর আদম মাটি থেকে সৃষ্ট। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যে বেশি আল্লাহভীরু। কোনো অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; তবে আল্লাহভীতির ভিত্তিতে।’ (আহমাদ, তাবরানি)

 

ন্যায়বিচার : সমাধিকারের সঙ্গে অন্য আরেকটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা ইনসাফ ও ন্যায্যতা। এ ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর এই বাণী বড়ই চমৎকার। যখন এক মাখজুমি মহিলার চুরির শাস্তিতে উসামা বিন জায়েদ (রা.) সুপারিশ করলেন, তখন রাসুল (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, ‘ওই সত্তার শপথ! যার হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, যদি (আমার মেয়ে) ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদও চুরি করত আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি)। ন্যায়বিচারের প্রতি গুরুত্বারোপ করে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমার কাছে দুজন বিচারপ্রার্থী হাজির হয়, তাহলে দ্বিতীয়জনের থেকে শুনে সিদ্ধান্ত দাও যেভাবে প্রথমজন থেকে শুনেছো। কেননা, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এটা বেশি স্পষ্ট। (বুখারি)

 

সবার সমান রাষ্ট্রীয় সুবিধা : ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানায় বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিক জীবনে প্রয়োজনীয় প্রতিটি সুবিধা ভোগ করবে। সে সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পাবে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিবেশীও তার খবর নেবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর কথা জেনে তৃপ্তিসহ আহার করে রাত্রি যাপনকারী আমার প্রতি ঈমান আনেনি।’(মুসলিম)

 

যুদ্ধে মহানুভবতা : যুদ্ধবন্দিদের অধিকারের কথা এলে ইসলামের আরো মহানুভবতার কথা স্পষ্ট হয়। কেননা, যুদ্ধের সময় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে যোদ্ধারা যা ইচ্ছা তাই করে। কিন্তু ইসলাম এ ক্ষেত্রেও অত্যন্ত উদারতা দেখিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা শিশুদের, নারীদের এবং বৃদ্ধদের হত্যা কোরো না।’ (মুসলিম)

 

সুতরাং পৃথিবীতে ইসলাম যে মানবাধিকার প্রণয়ন করেছে তা সব যুগে ইসলামী সভ্যতার মোড়কে অতুলনীয় এক মানব সভ্যতায় প্রতিফলিত হয়েছে। বিপরীতে আধুনিক সভ্যতার সন্তান দার্শনিক ফ্রিডরিক নিৎসকে আমরা বলতে দেখি, ‘দুর্বল ও অক্ষমদের ধ্বংস হওয়া উচিত—এই নীতিই বিশ্ব মানবতার প্রতি আমাদের ভালোবাসার প্রথম চিহ্ন আর ধ্বংস হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করাও কর্তব্য সবার।’ অর্থাৎ মৃতপ্রায় মেরে ফেলে জাতিকে পরিত্রাণ দাও। ইসলাম ও ইসলামী শরিয়ত কোনো দিন মূল্যবোধ ও নৈতিকতাবিবর্জিত এ রকম দর্শনে বিশ্বাসী ছিল না; বরং ইসলাম এমন সামগ্রিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের কথা বলে, যা পৃথিবীর সব জাতি, ভাষা ও বর্ণের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। সমাজে ইনসাফভিত্তিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ইসলামী শাসক দায়বদ্ধ। এ ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনকারীকে শাস্তিরও বিধান রাখা হয়েছে ইসলামে।

আরো পড়ুন

ইসলামে সম্পদের ব্যবহার ও সুরক্ষার পদ্ধতি

ইসলামে সম্পদের ব্যবহার ও সুরক্ষার পদ্ধতি

ইসলামী অর্থনীতিকে আরবি ভাষায় ‘ইকতিসাদ’ বলা হয়। যার অর্থ মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এ নামকরণ থেকেই …