বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯

আসবাবপত্রের মান নয়, প্রয়োজন সেবার মান পরিবর্তন

প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির আবশ্যিক কর্তব্য দেশের জনগণের নিঃস্বার্থ সেবা দেয়া। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ অর্থ অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার সংক্রান্ত যেকোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে, এরূপ অন্য কোনো কর্ম।

সহজ-সরল ভাষায় বলতে গেলে এর অর্থ দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যাদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধাদির সংস্থান করা হয় তারাই হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তি। প্রজাতন্ত্রের কর্মে যেমন সরকারের বেসামরিক ও সামরিক চাকরিজীবী রয়েছেন, অনুরূপ সাংবিধানিক পদধারীরাও রয়েছেন। সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে এমন অনেক রয়েছেন, যারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত আবার এমন অনেক রয়েছেন যারা রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত।

সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপ, বিরোধী দলের নেতা, সরকারি দলের উপনেতা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রধান প্রভৃতির নির্বাচন-পরবর্তী নিয়োগ লাভ ঘটে। একটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল পরাভূত হলে উপরোল্লিখিত সব পদে পরিবর্তন অত্যাসন্ন হয়ে পড়ে। এসব সাংবিধানিক পদধারীর সরকারি কার্যালয় এবং বাসভবনের যে অংশটুকু সরকারি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয় এর সব ধরনের আসবাবপত্র, কার্পেট, পর্দা, কম্পিউটার, টিভি, এয়ারকুলার, টেলিফোন, ইন্টারনেট সংযোগ প্রভৃতি সরকারি ব্যয়ে সংস্থান করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে উচ্চাদালতের বিচারকেরা নিয়োগ-পরবর্তী একটি নির্ধারিত বয়স অবধি কর্মে বহাল থাকেন। প্রধান নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনারেরা নিয়োগ-পরবর্তী পাঁচ বছর অবধি পদে বহাল থাকেন। সরকারি কর্ম কমিশনের সভাপতি ও সদস্যগণ এবং মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ পরবর্তী পাঁচ বছর বা একটি নির্ধারিত বয়সে উত্তীর্ণ হওয়া পর্যন্ত যেটি আগে ঘটে সে অবধি পদে বহাল থাকেন। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্য এরূপ ব্যক্তিকে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দান করেন। সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও অ্যাটর্নি জেনারেল এর ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সংবিধান নিশ্চুপ। অ্যাটর্নি জেনারেল সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো নির্দিষ্ট বয়স অবধি পদে বহাল থাকবেন নাকি রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি সাপেক্ষে পদে বহাল থাকবেন এ বিষয়ে বিতর্ক চলমান। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সাংবিধানিক পদধারীদের মতো রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে নিয়োগপ্রাপ্ত সাংবিধানিক পদধারীদের সরকারী কার্যালয় এবং বাসভবনের যে অংশটুকু সরকারী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয় এর সব ধরনের আসবাবপত্র, কার্পেট, পর্দা, কম্পিউটার, টিভি, এয়ারকুলার, টেলিফোন, ইন্টারনেট সংযোগ প্রভৃতি সরকারি ব্যয়ে সংস্থান করা হয়।

সরকারের বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থার মেয়াদি পদ এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন বাহিনী প্রধান ও অধিদফতর ও পরিদফতরের প্রধানদের মধ্যে প্রথমোল্লিখিত পদধারীরা একটি নির্ধারিত মেয়াদের জন্য নিয়োগ লাভ করেন এবং শেষোল্লিখিত পদধারীরা নির্ধারিত বয়সে উত্তীর্ণ হওয়া অবধি কর্মে বহাল থাকেন। শেষোল্লিখিত পদধারীদের মধ্যে অনেকে ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শী বিবেচনায় চাকরির নির্ধারিত বয়স অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এক, দুই অথবা সর্বোচ্চ তিন মেয়াদ পর্যন্ত চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ লাভ করেন। পূর্বে উল্লিখিত পদধারীদের মতো এসব পদধারীর সরকারি কার্যালয় এবং বাস ভবনের যে অংশটুকু সরকারি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হয় এর সব ধরনের আসবাবপত্র, কার্পেট, পর্দা, কম্পিউটার, টিভি, এয়ারকুলার, টেলিফোন, ইন্টারনেট সংযোগ প্রভৃতি সরকারি ব্যয়ে সংস্থান করা হয়।

আমাদের এ দেশ বিগত এক শতাব্দী সময় ব্যাপ্তিকালে প্রথমত, ব্রিটিশ অতঃপর পাকিস্তানিদের দিয়ে শাসিত হয়েছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশীদের দিয়ে শাসিত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের শাসনামলে এবং বাংলাদেশ অভ্যুদয়-পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত উপরোল্লিখিত পদধারীরা প্রকৃত অর্থেই জনগণকে সেবা দেয়ার মানসে পদে আসীন হতেন এবং পদের বিপরীতে সরকারি কার্যালয় ও বাসস্থানের যে অংশটুকু সরকারি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হতো এর জন্য প্রাধিকারের অতিরিক্ত কোনো ধরনের সুযোগ সুবিধাদি নিতেন না। সে সময় পদধারীর পরিবর্তন ঘটলেও সরকারি কার্যালয় অথবা বাসস্থানের যে অংশটুকু সরকারি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হতো এর আসবাবপত্র, পর্দা, কার্পেট প্রভৃতির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হতো না বরং এগুলোর সুরক্ষা সর্বোতভাবে নিশ্চিতের প্রয়াস নেয়া হতো।

সরকারের যেকোনো কার্যালয়ে ব্যবহৃত আসবাবপত্র গুণগত মান নির্ধারণ পরবর্তী সংস্থান করা হয়। এ সব আসবাবপত্রের নির্ধারিত কোনো মেয়াদ নেই; তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মেরামত ও রঙ করার আবশ্যকতা দেখা দিলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। যেকোনো কার্যালয়ের আসবাবপত্র একান্তই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট যে কমিটি রয়েছে তা দিয়ে বিষয়টি স্বীকৃত হতে হবে এবং কমিটির অনুমোদনসাপেক্ষে প্রতিস্থাপনের বিধান রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন কার্যালয়ের পদধারীদের ক্ষেত্রে দেখা যেত ব্যয় সঙ্কোচনের কথা ভেবে নতুন আসবাবপত্র কেনার ব্যাপারে একেবারেই অনীহ এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মেরামত ও রং করে এগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত কোনোভাবেই এগুলোর উপযোগিতা বিনষ্ট হতে দিতেন না।

বিগত প্রায় চার দশক ধরে দেখা যাচ্ছে কোনো ধরনের নিয়মনীতির বালাই বা তোয়াক্কা না করে পদধারীর পরিবর্তনের সাথে সাথে কার্যালয় ও বাসভবনের যে অংশটুকু কার্যালয় হিসেবে ব্যবহাত হয় এর আসবাবপত্র, পর্দা ও কার্পেট প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দেশের সাধারণ জনগণের করের অর্থ। একজন পদধারীর পরিবর্তনের সাথে সাথে তার কার্যালয় ও বাসস্থানস্থ কার্যালয়ের আসবাবপত্র, কার্পেট ও পর্দার পরিবর্তন কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের পরিবর্তন জনগণের করের অর্থের অপচয় বৈ অন্য কিছু নয়। এ পরিবর্তনের সাথে জনসেবার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বরং এ ধরনের পরিবর্তন একজন পদধারীকে বিলাসবহুল জীবনযাপনে উৎসাহ জোগায়। এমনও দেখা গেছে, একজন পদধারীর আসার পর যেসব আসবাবপত্র, কার্পেট ও পর্দা পরিবর্তন করা হয়েছে এর গুণগত মান ও মূল্য প্রতিস্থাপিত আসবাবপত্র, কার্পেট ও পর্দার চেয়ে ভালো ও সাশ্রয়ী ছিল। এ বিষয়ে বিভিন্ন কার্যালয়ের অধস্তন অনেকের আক্ষেপ থাকলেও পদধারীরা ক্ষমতাধর বিধায় সে আক্ষেপ সরকার তথা জনগণের স্বার্থরক্ষায় কোনো ধরনের ফলদায়ক অবদান রাখতে পারছে না।

এমন অনেক পদধারীর ক্ষেত্রে দেখা যায় সরকারি চাকরি থেকে অবসরের সময় বাসভবনস্থিত কার্যালয়ে সরকার থেকে সরবরাহ করা সামগ্রীর মধ্যে বিশেষত পর্দা ও কার্পেট ব্যবহার অনুপযোগী দেখিয়ে নিজে ব্যবহারের প্রয়াস নেন। কিছু কিছু পদধারীর ক্ষেত্রে আসবাবপত্রের কিছু সামগ্রী যেমন সোফা সেট, উন্নতমানের বসার চেয়ার, বুক শেলফ প্রভৃতি একান্ত নিজের করে নেয়া পদের মর্যাদার সাথে বেমানান হলেও এ ধরনের অন্যায় ও অনৈতিক কাজ তাদের মোটেও বিচলিত করে না।

এমন কিছু পদধারী রয়েছেন যাদের বাসভবন সম্পূর্ণরূপে সরকারি ব্যয়ে সজ্জিত করা হয়। এ ধরনের সজ্জিতকরণে বাসভবনে ব্যবহারের সব ধরনের সামগ্রী সরকারি অর্থে কেনা হয়। প্রথানুযায়ী একজন পদধারীর এ ধরনের বাসভবনে আসা ও যাওয়ার সময় সরকারের সরবরাহ করা সব সামগ্রীর তালিকা প্রত্যয়ন করে বুঝে নিতে ও বুঝিয়ে দিতে হয়, কিন্তু খুব কম পদধারীকে এ কাজটি সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে দেখা যায়।

সরকারি ব্যয়ে সরকার থেকে বরাদ্দ দেয়া বাসভবনে ব্যবহৃত সব ধরনের সামগ্রী সাজানোর পরিধি উপরোল্লিখিত পদধারী ছাড়া সামরিক বেসামরিক বিভিন্ন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা অবধি বিস্তৃত। এ সব বাসভবন বরাদ্দপ্রাপ্তদের সেখানে আসা ও যাওয়ার সময় পরিধেয় কাপড়চোপড় ও ব্যবহার্য প্রসাধনী ছাড়া আর কিছুই আনতে ও নিতে হয় না। এদের ক্ষেত্রেও আগমন ও প্রস্থানকালীন বুঝে নেয়া ও বুঝিয়ে দেয়ার মধ্যে স্বচ্ছতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।

একজন পদধারীর কার্যালয় বা বাসস্থানস্থ কার্যালয়ের আসবাবপত্র, কার্পেট ও পর্দা প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুযায়ী পরিবর্তন করা হলে আগের সামগ্রী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক নিলাম বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করার কথা; কিন্তু এ ক্ষেত্রেও দেখা যায় স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে নামমাত্র মূল্যে এগুলো হস্তান্তর করা হচ্ছে, যা সরকারকে যুক্তিসঙ্গত রাজস্ব পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে; অপর দিকে এ ধরনের একজন পদধারীর একটি কার্যালয়ে আগমন-পরবর্তী যখন এসব সামগ্রী কেনার কাজ শুরু হয়, তখন দেখা যায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তার ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে সরবরাহের কাজটি সমাধা করিয়ে উভয়ের জন্য লাভের দুয়ার অবারিত করে দেন।

সব পর্যায়ের পদধারীর সরকারি দায়িত্বের অন্যতম হলো নিঃস্বার্থ জনসেবা। কিন্তু একজন পদধারী যদি পদে আগমন-পরবর্তী নিয়মনীতি ও বিধিবিধানের ব্যত্যয়ে তার কার্যালয় ও বাসস্থানস্থ কার্যালয়ের সরকারি অর্থে ক্রয় করা সামগ্রীগুলো কোনো ধরনের যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া পরিবর্তন করেন সে ক্ষেত্রে সামগ্রীর পরিবর্তন একজন পদধারীর কাছে জনসেবার চেয়ে অনেক বড় কিছু। এ ধরনের বড় কিছু হতে যত দিন পর্যন্ত না একজন পদধারীর নিষ্কৃতি লাভ না ঘটবে, তত দিন পর্যন্ত মানসিকতা নয় আসবাবপত্র ও তদসংশ্লিষ্ট সামগ্রীর পরিবর্তন ঘটতেই থাকবে।

লেখক : ইকতেদার আহমেদ

সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

উৎসঃ   নয়াদিগন্ত

28 January 2019, Monday

আরো পড়ুন

দুটি ছবি একটি ব্যথা

জোড়া খুনের খুনি বখতিয়ার আলমের ‘মুক্তহস্ত’ বনাম নির্দোষ জাহালমের হাতকড়া। জোড়া খুন করলেও মানীর মান …